মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ. ও মসনবী শরীফ
আল্লাহ তাআলার প্রেম-পথের উজ্জ্বল দিশারী, আধ্যাত্মিক জ্ঞান পরশমণি গ্রন্থ 'মছনবী শরীফ'। এ পবিত্র গ্রন্থের সান্নিধ্যে আসতে মাওলানা রুমীর কিঞ্চিত পরিচয় আলোচনা।

1. মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ.

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ. sufibadi.com

সুফীকুল শিরোমণি, জ্ঞানতাপস মাওলানা রুমী (রঃ)-এর জীবন পরিচিতি

 

আল্লাহ তাআলার প্রেম-পথের উজ্জ্বল দিশারী, আধ্যাত্মিক জ্ঞান পরশমণি গ্রন্থ 'মছনবী শরীফ'। এ পবিত্র গ্রন্থের সান্নিধ্যে আসতে মাওলানা রুমীর কিঞ্চিত পরিচয় আলোচনা খারা ধন্য হওয়ার প্রয়োজন সকলেরই রয়েছে। গ্রন্থকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও মহব্বত গ্রন্থের বরকত আহরণে বিশেষ সহায়ক হয়। আমরা মাওলানার শুধু বাহ্যিক পরিচয়ের আলোচনায়ই ক্ষান্ত হব; মাওলানার পবিত্র আত্মার প্রতি সওয়াব রেসাই ও দোয়া দ্বারা প্রত্যেকে নিজ নিজ আকাঙ্ক্ষানুপাতে মঙ্গল ও কল্যাণ হাসিল করতে পারেন। জ্ঞানতাপস, দার্শনিক মাওলানা রুমীর অমর কীর্তি। 

 

নাম ও বংশ পরিচয়

 

মূল নাম- মুহাম্মদ, উপনাম- জালালুদ্দীন, আখ্যা- ফার্সী ভাষায় 'খোদাওয়ান্দেগার', অর্থ- আল্লাহওয়ালা প্রসিদ্ধি- মাওলানা রুমী।

 

তাঁর বংশ পিতার দিকে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে এবং মাতার দিকে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে মিলিত। মাতা-পিতার বংশ পরম্পরা থেকে উপকারলাভের যে সুযোগ মানুষের স্বাভাবিকভাবে থাকে, মাওলানা রুমীর সে সুযোগ পূর্ণ মাত্রায়ই ছিল।

 

সর্বাধিক জ্ঞানী ছিলেন।' (বোখারী শরীফ) আবু বকর (রা.) সম্পর্কে সাহাবীগণ বলতেন, كَانَ أَبُو بَكْرِ أَعْلَمُنَا -'আমাদের মধ্যে আবু বকর (রা.)

 

আলী (রা.) সম্পর্কে নবী করীম (সা.) বলেছেন, اَنَا دَارُ الْحِكْمَةِ وَعَلَى بَابُهَا - আমি (আল্লাহ প্রদত্ত( জ্ঞানের কেন্দ্র এবং আলী (রা.) হলেন এর দরজা।' এ দুই জ্ঞানসমুদ্রের প্রবাহ মিলিত হয়েছে মাওলানা রুমীর মধ্যে।

 

মাওলানা রুমীর পিতা এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মহান বুযুর্গ আলেম ছিলেন। তাঁরও মূল নাম মুহাম্মদ, উপনাম বাহাউদ্দীন। মাওলানা বাহাউদ্দীনের মা (মাওলানা রুমীর দাদী) খোরাসানের বাদশাহ আলাউদ্দীনের কন্যা ছিলেন।

 

মাওলানা বাহাউদ্দীনের পিতা (মাওলানা রুমীর দাদা)-ও অতিবড় বুযুর্গ আলেম ছিলেন। তাঁর নাম আহমাদুল হোসাইন। খোরাসানের বাদশাহ আলাউদ্দীন একদা স্বপ্নে দেখেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বলছেন, তোমার কন্যাকে আহমাদুল হোসাইনের সাথে বিয়ে দিয়ে দাও। বাদশাহ সকালবেলা আনন্দ-উৎফুল্লতার সাথে জেগে উঠেন এবং মাওলানা আহমাদুল হোসাইনকে অতিশয় সম্মান মর্যাদার সাথে দাওয়াত করে আনেন। তিনি শাহী মহলে তশরীফ আনলে বাদশাহ তাঁকে নিজের স্বপ্নের কথা খুলে বলেন। মাওলানা সাহেব এ সৌভাগ্যজনক প্রস্তাব আনন্দের সাথে গ্রহণ করেন। বাদশাহ নিজ মর্যাদানুপাতে মেয়ের বিয়ের কাজ সমাধা করে দেন। বিয়ের নয় মাস পরেই শাহজাদীর গর্ভে মাওলানা আহমাদুল হোসাইনের এক পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। এ পুত্রের নাম মূল নাম মুহাম্মদ এবং উপনাম বাহাউদ্দীন রাখা হয়। পুত্রের বয়স দশ বছর হলে পিতার ইন্তেকাল হয়। এ পুত্র অচিরেই এক মহান ব্যক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করেন; অল্প দিনের মধ্যেই জাহেরী বাতেনী বাহ্যিক আধ্যাত্মিক গুণগরিমা ও গৌরব লাভ করে মাওলানা বাহাউদ্দীন নামে বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করেন।

 

দেশ-বিদেশে তাঁর এত সুনাম প্রচারিত ও প্রভাব সম্প্রসারিত হয় যে, সব দিক থেকে ফতওয়া এবং কঠিন মাসআলাসমূহের সমাধানের জন্য সকলের দৃষ্টি তাঁর প্রতিই নিবদ্ধ হত। তাঁর ফতওয়া ও ফয়সালা আলেমদের কাছে বিনা দ্বিধায় গৃহীত হতে লাগল। একদা স্বপ্নে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে 'সুলতানুল ওলামা- 'আলেমকুল শাহানশাহ' আখ্যায় ভূষিত করেন। প্রকৃত প্রস্তাবেও তাঁর গুণগরিমার প্রভাব আলেমদের সবাইকে বিস্মিত করেছিল এবং সর্বশ্রেণীর লোক তাঁকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে 'সুলতানুল ওলামা' আখ্যায় বরণ করেনে। তিনি নিযামুদ্দীন রহমতুল্লাহে আলাইহির অদ্বিতীয় খলীফা ছিলেন। এ খ্যাতনামা বুযুর্গ আলেমের ঔরসেই মাওলানা রুমীর জন্ম।

 

মাওলানা রুমী রহমতুল্লাহে আলাইহির বংশ তালিকা নিম্নরূপ-

 

জালালুদ্দীন, পিতা- বাহাউদ্দীন, পিতা- আহমাদুল হোসাইন, পিতা- মাহমুদ, পিতা-মওদুদ, পিতা- সাবেত, পিতা- মোসাইয়াব, পিতা- আবু বকর রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু।

 

মাওলানা রুমীর জন্ম

 

তৎকালীন রোম রাজ্যের অন্তর্গত 'খোরাসান' অঞ্চলের 'বলখ' এলাকায় ৬০৪ হিজরী সনে মানবকুলের জ্যোতির্ময় নক্ষত্র মাওলানা রুমী জন্ম লাভ করেন। তিনি বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী পিতা মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) এবং তাঁর লক্ষ লক্ষ মুরীদানের চোখের মণিরূপে সকলের আদর যত্ন পেতে থাকেন। মাওলানা বাহাউদ্দীন রহমতুল্লাহে আলাইহির বিশিষ্ট খলীফা মাওলানা সৈয়দ বোরহানুদ্দীন রহমতুল্লাহে আলাইহির তত্ত্বাবধানে মাওলানা রুমীর বাল্যজীবন অতিবাহিত হয় এবং পিতার মৃত্যুর পরও তিনি তাঁরই ছায়াতলে আশ্রিত থাকেন।

 

'বলখ' ত্যাগ করে মক্কা শরীফ যাত্রা

 

সাধারণ মানুষের উপর মাওলানা রুমীর পিতার যে অসাধারণ প্রভাব ছিল, তা সহজেই বুঝা যায়। সর্বযুগে সর্বদেশেই যে ডালে গোলাপ ফুল জন্মে সে ডালে কাঁটাও জন্মে। যে বলখ দেশে সুলতানুল ওলামা বাহাউদ্দীন রহমাতুল্লাহে আলাইহির ন্যায় গোলাপ ফুটেছিল, সে দেশেই তাঁর কাঁটাও ছিল। এক শ্রেণীর আলেম নামধারী মানুষ সর্বসাধারণের মাঝে তাঁর অপ্রতিহত প্রভাব প্রতিপত্তিতে তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠে; এমনকি তারা সমকালীন বাদশাহকেও তাঁর প্রতি ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকে। একদা বাদশাহ তাঁর সাক্ষাতে আগমন করেন। সে সময় তাঁর মজলিসে হাজার হাজার আলেম-ওলামা, মুরীদ-মোতাকেদ উপস্থিত ছিলেন। এ দৃশ্যে বাদশাহ বিস্মিত স্তম্ভিত হন; ঈর্ষাকাতরদের একজন বাদশাহের সঙ্গেই ছিল। সে সুযোগ বুঝে বাদশাহকে বলল, পরিস্থিতি এরূপ চলতে থাকলে রাষ্ট্রক্ষমতা আপনার হাতে আর থাকবে কি? কথাটা বাদশাহের হৃদয়ে রেখাপাত করে।

 

এ সম্পর্কে বাদশাহ তার পরামর্শ চাইলেন। হীরকেই হীরক কাটে- শেখ বাহাউদ্দীনের স্বভাবের সাথে ওই ব্যক্তি ভালভাবেই পরিচিত ছিল, তাই সে তাঁর স্বভাব অনুপাতে কার্যকর পরামর্শ দিতে সক্ষম হয়। সে বলল, এ পরিস্থিতিতে শক্ত প্রতিরোধ টিকবে না; মোলায়েম ব্যবস্থার প্রয়োজন। আপনি এখনই গিয়ে রাজভাণ্ডারের চাবিগুচ্ছ এবং রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তরের স্বীকৃতিপত্র এই বলে তাঁর নিকট পাঠিয়ে দিন যে, দেশের সর্বময় প্রভাব-প্রতিপত্তি তো আপনার হাতেই রয়েছে; সুতরাং রাজক্ষমতাটুকুও আপনিই গ্রহণ করুন।

 

বাহাউদ্দীন (র.) বাদশাহর এ কাজের উদ্দেশ্য সবটুকুই বুঝে ফেলেন। তিনি বাদশাহকে সালামের সাথে বলে পাঠান, আমরা ফকীর দরবেশ মানুষ; রাজত্বের কোন মোহ আমাদের মোটেই নেই। বলখ রাজ্যে আপনিই বহাল থাকুন; আমি অচিরেই দেশ ত্যাগ করছি। বাদশাহকে দেশ ত্যাগ থেকে ফিরিয়ে রাখার এ সংবাদ পাঠিয়ে তিনি স্বদেশ ত্যাগের প্রস্তুতি নেন।মুহর্তের মধ্যে এ সংবাদ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মাঝে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। রাতের বে অটল থাকেন। অবশেষে বাদশাহ অনুরোধ করেন, আপনার যদি যেতেই হয় তবে এমনভাবে যাবেন যেন আপু দেশ ত্যাগ সম্পর্কে কেউই আঁচ করতে না পারে। বাদশাহর এ অনুরোধ তিনি রক্ষা করেন। সেমতে তি বাদশাহ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে দেশ ত্যাগ থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি নিজের সিদ্ধা স্বাভাবিকভাবে শুক্রবার দিন নির্ধারিত ওয়ায-নসীহত ইত্যাদি সব কিছুই করেন। পরের দিন শনিবার পরিবারবর্তন সকলের অজ্ঞাতে বলখ ত্যাগ করে হজ্জ ও যেয়ারতের উদ্দেশে মক্কার পথে বাগদাদ যাত্রা করেন। আছ

 

দেশ-বিদেশে সর্বত্র মাওলানা বাহাউদ্দীন রহমতুল্লাহে আলাইহির সুনাম সুখ্যাতি আগে থেকেই ছড়িয়ে পা ছিল। তাই তিনি যে কোন শহরের নিকটবর্তী হলে সংবাদ পাওয়ামাত্র সেখানকার সব আলেম ওলামা এবং নেতৃস্থানী লোকেরা বাইরে এসে তাঁকে আদর-অভ্যর্থনা ও জাঁকজমকের সাথে শহরে নিয়ে যেতেন। এভাবে তিনি বাগদাদপু অগ্রসর হতে থাকেন। মাওলানা রুমী তখনও বালক, তিনিও পিতার সঙ্গেই আছেন; বয়স ১০ বছরও হয়নি।

 

বাহাউদ্দীন (র.) নিজ সঙ্গীদেরসহ অত্যন্ত গোপনে বাগদাদে প্রবেশ করেন; সর্বসাধারণ মানুষ তাঁর সঙ্গী দলকে পক্ষিত ওই সময় বাগদাদে শায়খ শেহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (র.) অবস্থান করছিলেন, সেখানে তাঁর বিরাট প্রভাব ছিল আগন্তুকের দল ভাবতে লাগল। অতি স্বাভাবিকভাবে তাঁদের আগমন সংবাদ শায়খ শেহাবুদ্দীন রহমতুল্লা আলাইহিরও গোচরীভূত হয়। এ আগন্তুক দলে যে বাহাউদ্দীন (র.) ছিলেন, শেহাবুদ্দীন (র.) খুব সহজেই তাঁয়ে চিনে ফেলেন। তিনি অনেক লোকজন নিয়ে তাঁকে স্বাগত জানাবার জন্য আসেন। সাক্ষাতে নিজ বাহন থেরে অবতরণ করে শ্রদ্ধাভরে হস্ত চুম্বন এবং নিজের খানকায় অবস্থানের দাওয়াত করেন। বাহাউদ্দীন (র.) মাদরাসা অবস্থানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সেমতে উভয়ে মোস্তানসেরিয়া মাদরাসার প্রতি অগ্রসর হন। মাদ্রাসায় পৌঁছে বাহাউদ্দীন (র.) পায়ের মোজা খুলতে উদ্যত হলে শায়খ শেহাবুদ্দীন (র.) নিজ হাতে মোজা খুলে দেন। বিশে সম্মান ও যত্নের মধ্যে তিনি তথায় দু-তিন দিন অবস্থান করেন- বালক মাওলানা রুমীও তাঁর সঙ্গেই রয়েছেন।

 

অতঃপর বাগদাদ থেকে সরাসরি মক্কা শরীফ যাত্রা করেন। নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে হজ্জের এহরাম বাঁধেন। বালর মাওলানা রুমীও এহরাম বাঁধলেন। হজ্জ শেষে মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) মক্কা থেকে মদীনায় যাত্রা করেন। সেখানে পৌঁছে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যেয়ারত সম্পন্ন করেন। মদীনা শরীফে যেয়ারত শেষে তিনি রোমের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তৎকালীন রোমের একটি প্রদেশ ছিল 'আজারবাইজান'। বাহাউদ্দীন (র.) সদলবলে তথায় অবস্থান নিয়ে চার বছর সেখানেই অতিবাহিত করেন। এর পর সেখান থেকে 'লারেন্দা' নামক এলাকায় আসেন; এখানে সাত বছর বসবাস করেন।

 

মাওলানা রুমীর সাংসারিক জীবন

 

হযরত মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) লারেন্দায় অবস্থানকালে মাওলানা রুমীর বয়স ১৮ বছর, তিনি বয়োপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ সময়ই পিতা তাঁকে শাদী করিয়ে দেন এবং দোয়া করেন, নয় মাসেই যেন আল্লাহ তাআলা তাঁকে এক পুত্র সন্তান দান করেন। দোয়া কবুল হয়। বিয়ের ঠিক নয় মাস পরেই এক পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। মাওলানা রুমী (র.)-এর পিতা বাহাউদ্দীন (রঃ)ও তাঁর মায়ের বিয়ের ঠিক নয় মাস পরেই জন্ম লাভ করেন। সেমতে মাওলানা রুমীর প্রথম পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করলে তার নামও 'বাহাউদ্দীন' এবং উপনাম 'সোলতান ওয়ালাদ' রাখা হয়। মাওলানা রুমীর এ ছেলে তাঁর দাদা হযরত মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.)-এর মতই বিরাট ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছিলেন। মাওলানা রুমী তাঁর এ পুত্রকে অতিশয় ভালবাসতেন; অনেক ক্ষেত্রে তাঁর প্রশংসাও করেছেন। এমনকি একদিন বলে বসেন, হে বাহাউদ্দীন, দুনিয়াতে আমার আগমনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তোমার জন্ম। মাওলানা রুমী (র.) তাঁর মাদরাসার দেয়ালে লেখে রেখেছিলেন, "আমার বাহাউদ্দীন অতি নেকব্য; দুনিয়াতে তার আগমন যেরূপ আনন্দের সাথে হয়েছে, প্রস্থানও তদ্রূপই হবে।” তিনি পুত্রকে স্নেহভরে বলতেন, আকৃতি ও চরিত্র উভয় দিক দিয়ে তুমি আমার সমতুল্য। মাওলানা রুমীর 'আলাউদ্দীন' নামে আর এক পুত্র ছিল, কিন্তু তার অবস্থা বড় পুত্র বাহাউদ্দীনের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। এমনকি মাওলানা রুমীর পীর-মোরশেদ শাস্ত্র তাবরেয (র.) তার দলের হাতেই শহীদ হন।

 

কাওনিয়ায় আগমন ও পিতার মৃত্যু

 

সেকালে 'কাওনিয়া' একটি প্রসিদ্ধ নগর ছিল, যেখানে মাওলানা রুমী (র.) সমাহিত আছেন। তৎকালে এ নগর রোম রাজ্যেরই অন্তর্গত ছিল। তখন রোমের বাদশাহ ছিলেন আলাউদ্দীন কায়কোবাদ। মাওলানা রুমীর পিতা সুলতানুল ওলামা মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) যখন লারেন্দায় বসবাস করছিলেন, তখন রোমের বাদশাহ আলাউদ্দীন তাঁর সুনাম-সুখ্যাতিতে অতি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কাওনিয়ায় আগমনের অনুরোধ করেন। মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) সাত বছর লারেন্দায় বসবাস করে এ জায়গার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। এসময় বাদশাহের অনুরোধ আসলে তিনি তা গ্রহণ করেন এবং ৬২৬ হিজরী সনে 'লারেন্দা' থেকে 'কাওনিয়ায়' স্থানান্তরিত হন। মাওলানা রুমী (র.) ও পিতার সঙ্গেই আছেন; তখন তাঁর বয়স ২২ বছর।

 

মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) কাওনিয়ায় পৌঁছলে স্বয়ং বাদশাহ আলাউদ্দীন তাঁকে সাদর অভ্যর্থনা জানান। অতি বিনয়ের সাথে পায়ে হেঁটে এসে তাঁর সাথে সাক্ষাত করেন এবং বিশেষ যত্নসহকারে কাওনিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করান। বাদশাহ এবং তাঁর পারিষদবর্গ সকলেই মাওলানা বাহাউদ্দীনের মুরীদ হয়ে গেলেন। কাওনিয়ায় অবস্থানের দু বছর অতিবাহিত হলে মাওলানা রুমীর পিতা মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.) ইন্তেকাল করেন। তখন মাওলানা রুমীর বয়স ২৪ বছর।

 

পিতার সাথে মাওলানা রুমী কাওনিয়ায় এসেছিলেন, অবশেষে কাওনিয়া নগরই তাঁর স্থায়ী বাসস্থানে পরিণত হয়, সেখানেই তিনি চিরনিবাস গ্রহণ করেন। মাওলানা বাহাউদ্দীন রহমতুল্লাহে আলাইহির ইন্তেকালের পর তাঁর মুরীদান ও বন্ধু-বান্ধবগণ একমত হয়ে মাওলানা রুমী (র.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিযুক্ত করেন। সকলেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। বাদশাহ আলাউদ্দীন এবং তাঁর সহচরদের সকলেই মাওলানা রুমীকে তাঁর পিতার ন্যায়ই ভক্তি-শ্রদ্ধা করতে লাগলেন। কাওনিয়ার শানসকর্তা বদরুদ্দীন গওহরতাশ মাওলানা রুমীর গভীর জ্ঞান, সুপ্রশস্ত এলেম এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রতি মুগ্ধ ছিলেন। তিনি মাওলানা রুমীর আখ্যা-খোদাওয়ান্দেগার (আল্লাহওয়ালা) নামের স্মৃতিরূপে 'মাদরাসা খোদাওয়ান্দেগার' নামে কাওনিয়ায় একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা রুমী তথায় অধ্যাপনা, ওয়ায-নসীহত এবং ফতওয়া প্রদান ইত্যাদি কাজ করতেন। ৬৪২ হিজরী সনে ৩৮ বছর বয়স পর্যন্ত মাওলানা রুমীর অবস্থা এরকমই চলছিল। এ সময় মাওলানা রুমী যদিও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-গুণে ভূষিত ছিলেন, কিন্তু বাহ্যিক এলেম ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ছায়া তা আবৃত করে রেখেছিল। অতঃপর তাঁর জীবনে সে পরিবর্তন সূচিত হয় যদ্বারা তিনি মাওলানা রুমী থেকে মাওলানা মা'নবী তথা আধ্যাত্মিক মাওলানা নামের খ্যাতি লাভ করেন। শুধু তাই নয়, আধ্যাত্মিক জগতের বিশ্ব সম্রাটরূপে বরণীয় হয়ে ধরাপৃষ্ঠে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকলেন।

 

শামস তাবরেয (র.)-এর সাথে সাক্ষাত

 

শামসে তাবরেয 'আজারবাইজানের' অন্তর্গত তাবরেয অঞ্চলের অধিবাসী। তাঁর আসল নাম মুহাম্মদ, পিতা আলী, পিতামহ মালেকদাদ। উপনাম শামসুদ্দীন, অর্থ- দ্বীনের সূর্য। 'শাসে তাবরেয' নামেই তিনি সর্বসাধারণ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি সে মহাত্মা, যাঁর সান্নিধ্য মাওলানা রুমীর জন্য সোনায় সোহাগা হয়েছিল। যাঁর চুম্বক দৃষ্টি মাওলানা রুমী (র.)-কে পুরোপুরি ইহলোক বিমুখ করে আধ্যাত্মিক জগতের রাজকীয় সিংহাসনে সমাসীন করে। এ সম্পর্কে একটি বয়াত প্রসিদ্ধ আছে-

 

مولوی از خود نشد مولائے روم - تا غلام شمس تبریزی نشد.

 

-রোমের মাওলানা 'আধ্যাত্মিক মৌলভী' আখ্যার যোগ্য নিজে নিজে হতে পারেননি: যাবত নাশ। তাবরেযের গোলাম হয়েছিলেন।

 

নিজেকে অতি সাধারণ লোকের মধ্যে গোপন রাখতেন। অধিকাংশ সময় ভ্রমণরত থাকতেন; যে কারণেও শামসে তাবরেয (র.) আধ্যাত্মিক জগতের মহান ব্যক্তি ছিলেন: নিজেকে লুকিয়ে রাখতে ভালবাসতেন 'শাম্সপাখী' বলা হত। পায়জামার নেয়ার বুনে বিক্রি করে তা দ্বারাই জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 

শামসে তাবরেয রহমতুল্লাহে আলাইহির অন্তরে প্রবাহমান আধ্যাত্মিক সমুদ্র অতিশয় প্রশস্ত ও সুগভীর, কি প্রকাশ শক্তি অপেক্ষাকৃত সঙ্কীর্ণ ছিল। অধ্যাত্ম চিন্তা চেতনার যে প্রবল স্রোত শামসে তাবরেয রহমতুল্লাহে আলা অন্তর-সমুদ্রে প্রবাহমান ছিল, আল্লাহ তাআলার বন্দারা তা দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য ওই সমুদ্রের প্রশস্ততা পরি একটি মুখের প্রয়োজন ছিল, যেন ওই সমুদ্রের স্রোতধারা উক্ত প্রশস্ত মুখের মাধ্যমে সর্বত্র প্রবাহিত হতে পারে।

 

বর্ণিত আছে, শামসে তাবরেয (র.) এবং অপর এক বুযুর্গ ফখরুদ্দীন ইরাকী তৎকালীন বিশিষ্ট মোর্শেদে ক

 

বাবা কামাল খাজান্দী রহমতুল্লাহে আলাইহির সাহচর্যে ছিলেন। তাঁরা বাবা কামালের কাছ থেকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান। ফয়েয বরকত ও শিক্ষা গ্রহণ করতেন। তাঁদের মধ্য থেকে ফখরুদ্দীন ইরাকী (র.)-এর অন্তর-উদ্যানে যে ফল-ফুল প্রস্ফুটিত হত, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের যে সব আলোকরশ্মি তাঁর অন্তর আকাশে চমকাত, ওই সব তিনিস্থ সুন্দর প্রকাশ-ভঙ্গিমায় পদ্যে গদ্যে সাজিয়ে বাবা কামালের সম্মুখে পেশ করতেন; এতে বাবা কামাল (র.) স্বচ্ছ আনন্দিত হতেন। পক্ষান্তরে শাসে তাবরেয (র.) ভাবগম্ভীর অবস্থায় সর্বদা নির্বাক নিঃশব্দ থাকতেন।

 

একদিন বাবা কামাল (র.) শাম্স (র.)-কে বললেন, প্রিয় বৎস, ফখরুদ্দীন যেসব শুভ আধ্যাত্মিকতা লাওর থাকে, তোমার কি ওই শ্রেণীর কিছু লাভ হয় না? শাম্স (র.) বললেন, হুযুরের বরকত ও দোয়ায় ওই রত্ন আমার ধা হয়ে থাকে, কিন্তু ফখরুদ্দীন সাহেবের ন্যায় তা ব্যক্ত করার সামর্থ আমার নেই। তৎক্ষণাত বাবা কামাল (র.) সো করলেন, আল্লাহ তাআলা তোমাকে এমন একজন সহচর দান করুন যিনি তোমার আধ্যাত্মিক জ্ঞান-বিদ্যা, ফ্যা বরকত প্রকাশে তোমার মুখপাত্র হন।

 

বাবা কামাল রহমতুল্লাহে আলাইহির দোয়া আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হয়। শাসে তাবরেয (র.) তাঁর ধ্যি সহচররূপে মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (র.)-কে লাভ করেন। মাওলানা রুমী (র.) নিজেও আধ্যাত্মিকতার সৃংশা সাগর ছিলেন; যখন শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির মহাসাগরের সাথে এর সংযোগ হয়ে গেল, তখন এর তরঙ্গমায় এক অসাধারণ রূপ ধারণ করে। মাওলানা রুমী (র.) অসাধারণ বাকপটু ছিলেন। প্রকাশ-জ্ঞান ও বাকপটুতায় আল্লা তাআলা তাঁকে দৈবশক্তি দান করেন। বাবা কামাল রহমতুল্লাহে আলাইহির দোয়ার বাস্তবায়নই ছিল মাওলানা কর্মী 'মহুনবী শরীফ'। তিনি এ গ্রন্থে মাওলানা শাসে তাবরেয রহমতুল্লাহে আলাইহির নামে আধ্যাত্মিক জগতের অসংখ জ্ঞান ও আলো বিকিরণ করে গেছেন। সারা বিশ্ব কেয়ামত পর্যন্ত তা দ্বারা উপকৃত হতে থাকবে।

 

শামসে তাবরেয (র.) ও দোয়া করতেন, হে আল্লাহ, আমাকে এমন একজন সহচর দান করুন যে আমার সাহচর্যের যোগ্য পাত্র হয়। একদা শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির পীর তাঁকে বললেন, তুমি রোমে যাও; তথায় বিরা দগ্ধ অন্তরওয়ালা এক ব্যক্তি আছে, তাকে উজ্জ্বল করে আস। সেমতে তিনি ৬৪২ সনের মধ্যবর্তী সময়ে কাওনিয়া পৌঁছেন। তিনি নিজ স্বভাব অনুযায়ী গোপনীয়তা অবলম্বনের উদ্দেশে হালুয়া প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের মহল্লার অবস্থান গ্রহণ করেন।

 

তখন মাওলানা রুমীর বাহ্যিক জ্ঞান-বিদ্যার বিরাট প্রভাব প্রতাপ চালু ছিল। সর্বদা তাঁর কাছে বহু শিষ্য শাগেনি ভিড় লেগে থাকত। একদা তিনি বাহনে আরোহিত অবস্থায় হালুয়া প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতাদের মহল্লার পথে যাচ্ছিলেন, তাঁর চতুর্দিক ঘিরে ছিল অনেক শিষ্য-শার্গেদ। এ অবস্থায় মাওলানা রুমীর সঙ্গে শামস রহমতুল্লাহে আলাইহির কিছু কথাবার্তা হয়। এতে মাওলানা রুমী (র.) তাঁর ব্যক্তিত্বর কিছুটা আঁচ করতে পেরে তাঁকে সঙ্গে করে মাদরাসায় নিয়ে আসেন। ওই দিন শাম্স (র.) তাঁর বাসস্থানে চলে যান। পরে আর একদিন নিজেই মাওলানা রুমীর নিকট আসেন। সে সময় মাওলানা রুমী একটি হাউজের কিনারায় বসে ছিলেন। তাঁর সম্মুখে বাহ্যিক জ্ঞান বিদ্যা বিষয়ক কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ কিতাব ছিল। শাম্স (র.) মাওলানা রুমীকে ওই কিতাবগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, এগুলো কি? মাওলানা রুমী বললেন, এগুলো বাহ্যিক জ্ঞান-বিদ্যার কিতাব- এ সবের সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক? এরকমও বলা হয়ে থাকে, শাম্স (র.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, این چیست এ সব কি? মাওলানা রুমী (র.( উত্তরে বলেছিলেন, این علمیست که تو نمیدانی এটা এমন বিদ্যা যা আপনি অবগত নন। শামসে তাবরেয (র.) এর প্রতিউত্তর দেবার ইচ্ছা করেন। মাওলানা রুমী কোন ব্যস্ততায় অন্যমনস্ক হায় পড়লে শামস (র.) ওই কিতাবগুলো হাউজের পানিতে ফেলে দেন। মাওলানা রুমী (র.) ঘটনা জ্ঞাত হয়ে অত্যধিক অনুতপ্ত হয়ে বললেন, আপনি আমাকে খুন করে ফেলেছেন; অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য কিতাবসমূহ আপনি নষ্ট করেছেন। এ কিতাবগুলো কোথাও পাওয়া যাবে না। শাম্‌ (র.) তৎক্ষণাত কিতাবগুলো এক একটা করে হাউজ থেকে উঠিয়ে দেন; কিতাবগুলো সম্পূর্ণ শুকনা, কোথাও পানি স্পর্শ করেছে বলে দেখা যাচ্ছিল না। এ ঘটনা দেখে মাওলানা রুমী (র.) অবাক হয়ে রইলেন। বিস্ময়ে বলে উঠলেন, জনাব, এ কি? শাম্স (র.) বললেন, এটা এক ভিন্ন ব্যাপার- এর সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক? কথিত আছে, মাওলানা রুমী জিজ্ঞেস করেছিলেন- این چیست-এর রহস্য কি? শামস )র.) বললেন, ایس سریست که تو نمیدانی এটা এমন এক রহস্য যা আপনি অবগত নন।

 

হালুয়া প্রস্তুতকারকদের মহল্লার পথে একবার শাম্স (র.) মাওলানা রুমীর অন্তর আকৃষ্ট করেছিলেন, এ ঘটনা দ্বারা পুনরায় আকৃষ্ট করলেন। এবারের আকর্ষণ এতই কঠোর ছিল যে, মাওলানা রুমী আর স্থির থাকতে পারেননি; উৎসর্গিত মুরীদের ন্যায় হয়ে উভয়ে দুধ চিনির ন্যায় মিশে গেলেন। চল্লিশ দিন, কারও মতে তিন মাস, কারো মতে ছয় মাস উভয়ে এক সঙ্গে এক ঘরে সকল সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অতিবাহিত করেন। কারও সাধ্য ছিল না তথায় প্রবেশ করে তাঁদের অন্যমনস্ক করার।

 

এ ঘটনায় শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহ মাওলানা রুমীকে তাঁর উৎসর্গিত প্রাণ খাদেম বানিয়ে ফেলেন। তাঁর অবস্থা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এত দিন তিনি নিজেই লাখ লাখ মুরীদের পীর ছিলেন; বিরাট প্রতাপের সাথে দরবারে উপবিষ্ট থাকতেন আর প্রতিদিন শত শত আলেম, সুফী এবং অগণিত শিষ্য ভক্তের গমনাগমন হতে থাকত। প্রকৃত প্রস্তাবেও তিনি সেরূপ অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। শত শত ওয়ায মাহফিল তিনি সরগরম রেখেছেন; তাঁর মাদরাসা ছিল এবং খানকাও ছিল। বাহ্যিক আধ্যাত্মিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল, তাঁর সেখানে সব রকম শিক্ষার্থীর ভিড় লেগে থাকত। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মধ্যে রাজকীয় প্রতাপও ছিল; বাদশাহ এবং উজিররা পর্যন্ত তাঁর ভক্ত ও তাঁর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।

 

শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির স্পর্শে তিনি নিরেট ফকীর-দরবেশ হয়ে গেলেন। পূর্বেও তিনি উচ্চ মর্তবার দরবেশ ও কামেল সুফী ছিলেন, কিন্তু তাতে রাজকীয় শান দৃশ্যমান ছিল। তার বিপরীতে এখন তিনি সম্পূর্ণ ফকীর প্রকৃতির দরবেশ হয়ে গেছেন। মাদরাসায় অধ্যাপনা, খানকায় আধ্যাত্মিক শিক্ষাদান এবং ওয়ায-নসীহত সবকিছুই তিনি পরিত্যাগ করেছেন। তাঁর সবুজ-শ্যামল উদ্যানে যেন রাজঋতু বসন্তের পরিবর্তে হিম ঋতু শীত এসে গেছে। তাই সেখানে পাখির সমাগম নেই, ফুলের সৌরভ নেই, সব যেন উজাড় হয়ে গেছে। প্রকৃত প্রস্তাবে মাওলানা রুমীর এ অবস্থার তাৎপর্য ছিল পরিপূর্ণতা। নদ-নদীতে যখন জোয়ার আসতে থাকে, তখন প্রবল স্রোত পরিদৃষ্ট হয় এবং কত কিছু ভাসিয়ে নিয়ে চলে। জোয়ার যখন পরিপূর্ণ হয়ে যায়, পানি যখন কানায় কানায় ভরে উঠে, তখন আর স্রোত থাকে না। প্রখর স্রোতের নদীতেও থমথমে ভাব বিরাজ করতে থাকে। সব কিছু নিশ্চল হয়ে পড়ে। এর পরেই এ পানি বহির্গমনের পথে প্রবাহিত হয়। মাওলানা রুমীর মধ্যে বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-বিদ্যার প্রবল স্রোত প্রবাহমান ছিল। শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির স্পর্শে সেই স্রোত অনবিতিবিলম্বেই পূর্ণ জোয়ারে রূপ নেয় এবং তাঁর অন্তর-নদী আধ্যাত্মিক জ্ঞান গুণে কানায় কানায় ভরে উঠে, তাই তাঁর মধ্যে সাময়িক একটা নিশ্চল অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। অন্তশ্চক্ষুহীন ভক্তরা এ প্রতিক্রিয়ায় বেসামাল হয়ে পড়ে। তারা শামস রহমতুল্লাহে আলাইহির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উচু মাওলানা রুমীর এ সাময়িক নিশ্চলতা প্রকৃত প্রস্তাবে বহির্গামী স্রোত আরম্ভের পূর্বাভাস ছিল, কিন্তু ঘ শামস (র.)-কে চেনার জানার যোগ্যতা তাদের ছিল না। তারা ভাবল, এ লোকটা কোথা থেকে এসে আমাস মাওলানাকে সম্পূর্ণ নীরব নিশ্চল স্থবির বানিয়ে ফেলেছে।

 

মাওলানা রুমীর সাক্ষাতে তো তারা শামস (র.)-কে কিছু বলতে সাহস করত না, কিন্তু তাঁর অসাক্ষাতে শত ফলে দীর্ঘ এক বছরের অধিককাল কাওনিয়ায় অবস্থান করার পর হঠাৎ একদিন গোপনে তিনি কাওনিয়া ছেড়ে জ (র.)-কে নানাভাবে উৎপীডন এবং এরূপ দুর্ব্যবহার করত যেন তিনি চলে যান। শামুস (র.) উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠে যান।

 

যে আশায় শামস (র.)-এর কাওনিয়া ত্যাগ চেয়েছিল, প্রতিক্রিয়া তার বিপরীত হয়। এতদিন মাওলানা রুমী ও শামুস (র.)-কে হারিয়ে মাওলানা রুমী (র.) বেহাল হয়ে পড়েন: তাঁর অস্থিরতার সীমা থাকল না। নাদান ভক্তগ ওয়ায-নসীহত ও অধ্যাপনা থেকে বিরত থাকতেন, কিন্তু পূর্ণ শান্ত ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন। এখন সে সব রহিং করা কাজ পুনঃ আরম্ভ তো হলই না, অধিকন্ত তিনি অস্বাভাবিক ব্যাকুল-বিহ্বল হয়ে পড়েন। ভক্তগণ যে তাঁকে শ অবস্থায় দেখবে, তাঁর নিকট বসবে, সে সুযোগও আর থাকেনি।

 

দীর্ঘ দিন পর হঠাৎ মাওলানা রুমী (র.) শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির একখানা পত্র পেলেন। এ পত্র তিন্নি দামেশক থেকে লেখেছেন। এতে মাওলানা রুমীর অবস্থা কিছুটা শান্ত হয়। তিনি শাম্স (র.)-কে পর পর চারখম পত্র লেখেন এবং তাঁর বিচ্ছেদে নিজের যে দুরবস্থা হয়েছে তা তাঁকে জ্ঞাত করেন। এদিকে কাওনিয়ায় যেসব লোভ শামুস (র.)-কে যাতনা দিয়েছিল, মাওলানা রুমী (র.) তাদের এ দুষ্কর্ম থেকে তওবা করান। তাদের সম্পর্কে নিশ্চিয় হয়ে তিনি শাম্‌স (র.)-কে কাওনিয়ায়ে আনার ব্যবস্থায় সচেষ্ট হন।

 

শামস (র.)-এর কাওনিয়ায় প্রত্যাবর্তন

 

মাওলানা রুমী (র.) শামস রহমতুল্লাহে আলাইহকে কাওনিয়ায় প্রত্যাবর্তনের আবেদন জানিয়ে একখান হৃদয়গ্রাহী পত্র লেখেন। সে পত্র এবং পথ খরচ ও কিছু হাদিয়া নিজ পুত্র মাওলানা বাহাউদ্দীনের হাতে দিয়ে দামেশকে পাঠান। তাকে বলে দিলেন, পত্র এবং হাদিয়া তাঁর চরণে নিবেদন করে আমার পক্ষ থেকে মৌখিক দরখাস্ত পেশ করবে এবং বলবে, কাওনিয়ায় যারা তাঁর সাথে বেআদবী করেছিল তারা তওবা করে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছে; এখন তিনি যেন কাওনিয়ায় তশরীফ আনেন।

 

মাওলানা রুমী (র.) স্বীয় পুত্র মাওলানা বাহাউদ্দীন (র.)-কে সম্পূর্ণ নির্ধারিত করে শাম্স (র.)-কে পাবার ঠিকানাও বলে দেন। তাঁকে বললেন, দামেশকের অমুক মুসাফিরখানায় গিয়ে দেখবে, এক খ্রিস্টান বালকের সাথে শাম্স (র.) পাশা খেলছেন। পূর্বেই বলা হয়েছে, শামস (র.) সাধারণতঃ নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন, মুসাফিরখানায় অবস্থান এবং খ্রিস্টান বালকের সাথে পাশা খেলা এ সবই তাঁর নিজেকে লুকাবার ব্যবস্থা ছিল মাত্র। তাই মাওলানা রুমী (র.) পুত্রকে বলে দিলেন, হুশিয়ার, ওই অবস্থা দেখে তাঁর প্রতি কোন রকম কুধারণার বশবর্তী হয়ো না, তা তাঁর নিজেকে গোপন করার উপায় মাত্র। তিনি এরকম অবস্থার আবরণে লুকিয়ে থাকেন।

 

সব কথা বুঝে নিয়ে মাওলানা বাহাউদ্দীন কতিপয় সঙ্গীসহ দামেশকের পথে যাত্রা করেন। রুমী (র.)-এর বলে দেয়া অনুযায়ী খ্রিস্টান বালকের সাথে পাশা খেলারত অবস্থায় তাঁকে পেয়ে যান। মাওলানা বাহাউদ্দীন তাঁর সঙ্গীদের সং শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির সম্মুখে পৌছে অস্বাভাবিক শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। খ্রিস্টান বালক এ সব দেখে অবাক হয়ে রইল। শাম্স (র.)-এর বিস্তারিত অবস্থা জানতে পেয়ে সে অত্যধিক লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী হয়, আর মুহূর্তেই ইসলাম গ্রহণ করে। আল্লাহওয়ালাদের সাহচর্য বিফলে যায় না। পাশা খেলার মধ্য দিয়ে খ্রিস্টান বালক শামস রহমতুল্লাহে আলাইহির যে সান্নিধ্য লাভ করেছিল, এর বদৌলত ওই বালক আল্লাহ তাআলার অসাধারণ নেয়ামত লাভ করে। তার সৌভাগ্যের চাঁদ উদিত হয়। শাম্স (র.) সে সময়ই তাকে খেলাফত দিয়ে তার দেশে পাঠিয়ে দেন। যাওয়ার কালে বলে দিলেন, দেশে গিয়ে তুমি লোকদের হেদায়াত কর; তুমি ওই দেশের 'কুতুব' নিযুক্ত হলে। মাওলানা বাহাউদ্দীন শাম্স (র.)-কে এতদূর আদব-তাজীম করলেন যে, রাস্তা খরচের টাকা তাঁর পাপোশের উপর রেখে তা কাওনিয়ামুখী করে দেন, যার অর্থ কাওনিয়ায় যাত্রার দরখাস্ত পেশ করা।

 

মৌখিকভাবে মাওলানা রুমীর সব কথা বাহাউদ্দীন (র.) শামসে তাবরেয (র.)-কে জানিয়ে বললেন, কাওনিয়ায় আপনার বিরুদ্ধবাদীরা সবাই তওবা করে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছে। মাওলানা রুমী তনয় বাহাউদ্দীনের আবেদন নিবেদন ও প্রকৃত পরিস্থিতি বর্ণনা করার পর শাম্স (র.) কাওনিয়ার উদ্দেশে দামেশক ত্যাগ করেন। মাওলানা বাহাউদ্দীন সারা পথে তাঁর এত খেদমত করেন, যাতে তিনি তাঁর প্রতি অত্যধিক সন্তুষ্ট হন। কাওনিয়া পৌঁছলে মাওলানা রুমী (র.) শামস (র.)-কে পেয়ে খুশীর চরমে পৌঁছেন। দ্বিগুণ খুশী এ জন্যও হয়েছিলেন যে, শাম্স (র.) কাওনিয়ায় পৌঁছে মাওলানা রুমীর কাছে পথে তাঁর চেলে বাহাউদ্দীনের অসাধারণ খেদমতের কথা ব্যক্ত করেন। তাই মাওলানা রুমী (র.) পুত্র মাওলানা বাহাউদ্দীনের প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হন এবং অন্তর থেকে দোয়া করেন।

 

শামস (র.) থেকে চিরবিচ্ছেদ

 

শাম্স (র.) দ্বিতীয় বার কাওনিয়ায় আসলে মাওলানা রুমী ও তিনি খুবই আনন্দে কিছুকাল অতিবাহিত করেন। তার পরই পুনরায় এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শাম্স রহমতুল্লাহে আলাইহির প্রতি বিদ্বেষভাব সৃষ্টি হয়। যাদের মধ্যে মাওলানা রুমীর ছেলে আলাউদ্দীনও ছিল। তাদের বিদ্বেষ চরমে পৌঁছে। যেভাবেই হোক, মাওলানা রুমী থেকে শাম্স (র.)-কে বিচ্ছিন্ন করতেই হবে। পরবর্তী ইতিহাসের বিবরণ দুই রকম দেখা যায়।

 

এক বিবরণ মতে, মাওলানা রুমীর ছেলে আলাউদ্দীনসহ বিরুদ্ধবাদীরা আর কোন উপায় না দেখে শাস (র.)-কে গোপনে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। শামসুদ্দীন তাবরেযী রহমতুল্লাহে আলাইহির কিসমতে শহীদ হওয়ার মর্তবা নির্ধারিত ছিল। একদা অন্ধকার রজনীতে শামস (র.) এবং মাওলানা রুমী (র.) নির্জনে বসে ছিলেন। এ সময় বাইরে থেকে এক ব্যক্তি শাম্স (র.)-কে ডাকলে তিনি মাওলানা রুমীকে বললেন, আমাকে হত্যা করার জন্য ডাকা হচ্ছে, যেহেতু দুনিয়ার মুসাফিরখানায় অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাই যাওয়া আবশ্যক। মাওলানা রুমী (র.) কিছু সময় চুপ থেকে এ আয়াত তেলাওয়াত করেন-

 

الا لَهُ الْخَلْقُ وَالْاَمْرُ فَتَبَرَكَ اللهُ رَبُّ الْعَلَمِينَ -

 

-'সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর আদেশ দেয়া একমাত্র আল্লাহর ক্ষমতায়; সারা জাহানের প্রভু পরওয়ারদেগার অতি মহান।'

 

শাম্স (র.) বের হয়ে পড়েন, বাইরে মাওলানা রুমীর ছেলে আলাউদ্দীনসহ সাত জন অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা বড় একটি ছুরি দ্বারা শামস্ রহমতুল্লাহে আলাইহির উপর আক্রমণ করে। তিনি অতি জোরে এক চিৎকার করলেন; তাতে তাঁকে আক্রমণকারী লোকগুলো বেহুশ হয়ে পড়ে। কিছু সময় পরে তাদের চেতনা ফিরে আসলে তারা রক্ত দেখতে পায়, কিন্তু শামস্ (র.) জীবিত বা মরা কোন অবস্থায়ই সেখানে নেই, এটাই তাঁর জীবনের শেষ ইতিহাস। কিছু দিনের মধ্যেই ওই লোকগুলো নানা বিপদে ধ্বংস হয়। আলাউদ্দীনও ভীষণ রোগে আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হয়।

 

আর এক বিবরণ মতে, বিরুদ্ধবাদীদের উৎপীড়নে শাম্স (র.) অতিশয় মর্মাহত হন এবং পূর্বের ন্যায়ই একদা রাতের অন্ধকারে কাওনিয়া ত্যাগ করে চলে যান। নিজেকে লুকিয়ে রাখার অভ্যাস তো তাঁর ছিলই, এ কাজে তিনি সুকৌশলী ও পটু ছিলেন। এবার তিনি নিজেকে এমনভাবে লুকালেন, দুনিয়া আর মাওলানা রুমীর নিকট তাঁর খোঁজ পাঠাতে সক্ষম হয়নি।

Sufi.News Portal (Sufibadi.com) is a digital sanctuary spreading Sufi wisdom, human love, and interfaith harmony. We highlight saint biographies, sacred traditions, and spiritual practices to foster inner peace and global unity. ​Join our community grounded in compassion and unconditional love! ​📞 Contact: +880-1840624624 (BD) / +91-9332594925 (IN) | Email: moinur.chisty@sufibadi.com | Web: Sufibadi.com Email: sufibadillc@gmail.com

Comments

https://sufi.news/assets/images/user-avatar-s.jpg

0 comment

Write the first comment for this!