1. হযরত সুলতান বাহু (রহ.)
sufibadi.com
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি
সরওয়ারী কাদেরী তরিকার প্রবর্তক ও পাঞ্জাবের প্রখ্যাত সুফি কবি
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন কাদেরিয়া তরিকার একটি শাখা সরওয়ারী কাদেরী তরিকার প্রবর্তক। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সুলতান মুহাম্মদ। তবে তিনি সব সময় আল্লাহ তাআলার স্মরণে—বিশেষত ‘হু’ জিকিরে—নিমগ্ন থাকতেন। এ কারণে তিনি ‘বাহু’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
নিজের নামের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বোঝাতে তিনি লিখেছেন—
“একটি বিন্দুর পার্থক্যে ‘বাহু’ হয়ে যায় ‘ইয়া হু’; আর বাহু সর্বদা ‘ইয়া হু’-এর স্মরণে নিমগ্ন থাকে।”
সুফি কবিতায় সহজ ভাষা ও গ্রামীণ উপমা
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি গভীর আধ্যাত্মিক ভাবনাকে সহজ ও পরিচিত উপমার সাহায্যে প্রকাশ করতেন। বাগান করা, গাছ লাগানো কিংবা গাছের পরিচর্যার মতো গ্রামীণ জীবনের সাধারণ বিষয় থেকে তিনি উপমা নিতেন। এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী সুফি সাধকদের গভীর চিন্তাধারাও সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলেছিলেন।
তাঁর অনেক কবিতার পঙ্ক্তির শেষে ‘হু’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দের মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলার স্মরণ, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং আত্মিক আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর বহুল পরিচিত একটি সুফি গীতিকবিতার পঙ্ক্তি—
“আলিফ—আল্লাহ চম্বে দি বুটি, মুর্শিদ মন বিচ লাই হু…”
এই পঙ্ক্তিতে আল্লাহর প্রেম এবং মুর্শিদের আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনায় অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার ভাবটি কাব্যিকভাবে ফুটে উঠেছে।
তাঁর রচনাবলি
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নামে তাসাউফবিষয়ক চল্লিশটিরও বেশি গ্রন্থের কথা প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘নূরুল হুদা’ ও ‘রিসালায়ে রূহ’।
তবে তাঁর পাঞ্জাবি কবিতার সংকলন ‘আবিয়াতে বাহু’ সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই কবিতাগুলোর মূল বিষয় হলো তাওহিদ—অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার একত্ব, তাঁর প্রতি গভীর প্রেম এবং আত্মশুদ্ধি।
আজও তাঁর কবিতা ও সুফি গীতিকবিতাগুলো কাওয়ালি ও বিভিন্ন সুফি সংগীতের সুরে পরিবেশিত হয়। তাঁর রচনায় সহজ ভাষার সঙ্গে গভীর আধ্যাত্মিক ভাবের যে সমন্বয় ঘটেছে, তা তাঁকে পাঞ্জাবি সুফি সাহিত্যের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
বংশপরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর পরিবার হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বংশধর এবং হাশেমি গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তাঁর পিতা সুলতান বায়াজিদ মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দরবারে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পাঞ্জাবের ঝং জেলার শেরকোট গ্রাম জায়গির হিসেবে লাভ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর পরিবার সেখানে বসতি স্থাপন করে।
শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনা
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর ধর্মীয় শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তাঁর নেককার মাতা বিবি রাসতি-এর স্নেহময় তত্ত্বাবধানে। তাঁর মা-ই তাঁকে দ্বীনি শিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন।
মায়ের নির্দেশনায় তিনি প্রথমে শায়খ হাবিবুল্লাহ কাদেরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে আরও জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে দিল্লিতে গিয়ে শায়খ আবদুর রহিম কাদেরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর সান্নিধ্যে থাকেন। শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার এই পর্যায় শেষে তিনি পাঞ্জাবে ফিরে আসেন।
ওফাত ও মাজার শরিফ
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ১ জমাদিউস সানি, ১১০২ হিজরি / ১৬৯১ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গড় মহারাজা এলাকায় তাঁর মাজার শরিফ অবস্থিত। প্রতিবছর তাঁর উরস উপলক্ষে বহু ভক্ত ও অনুরাগী সেখানে সমবেত হন। এ সময় তাঁর সুফি কবিতা ও আধ্যাত্মিক বাণী গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ করা হয় এবং গাওয়া হয়।
সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর জীবন, সাধনা ও সাহিত্যকর্ম উপমহাদেশের সুফি ঐতিহ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। সহজ ভাষায় আল্লাহর প্রেম, তাওহিদ ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
আল্লাহ তাআলা সুলতান বাহু রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর প্রতি অশেষ রহমত বর্ষণ করুন। আমিন।

Comments
0 comment