সিরাজুল মিল্লাত মুয়াইয়্যুদ্দীন খাজা মুহাম্মাদ বাকি বিল্লাহ রহ.
শায়েখে আজাল্ল, কুতুবুল আকতাব, ইমামুল আইম্মা, রাজিউদ্দীন আবুল মুয়াইয়্যিদ, আব্দুল বাকি ইবনে আব্দুস সালাম বদখশানী। তিনি খাজা বাকি বিল্লাহ কাবুলী ও দেহলভী নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন।



শায়েখে আজাল্ল, কুতুবুল আকতাব, ইমামুল আইম্মা, রাজিউদ্দীন আবুল মুয়াইয়্যিদ, আব্দুল বাকি ইবনে আব্দুস সালাম বদখশানী। তিনি খাজা বাকি বিল্লাহ কাবুলী ও দেহলভী নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার অস্তিত্ব ছিল হিন্দুস্তানের জন্য অশেষ বরকত ও রহমতের কারণ। তার পুতপবিত্র জীবন ছিল এবাদত-বন্দেগীতে ভাস্বর; জবান হাকিকতের ব্যাখ্যায় সজীব ও প্রাণবন্ত। ছিলেন ইলমে মারেফতের উজ্জ্বল নমুনা এবং বেলায়েত ও রুহানিয়্যতের আলোর মিনার।

জন্ম ও বংশ-পরিচয় : 

তার নাম খাজা মুহাম্মাদ বাকী; উপাধী বাকি বিল্লাহ। পিতার নাম কাজী আব্দুস সালাম খিলজী। তিনি ছিলেন সমরকন্দের কুরাইশী বংশোদ্ভূত আলেম। কাবুলে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রায়ই থাকতেন অজদের হালতে। খাজা মুহাম্মাদ বাকি বিল্লাহর জন্ম ৯৭১ হিজরী মোতাবেক ১৫৬৪ খৃস্টাব্দে কাবুলে। তার মাতুল বংশক্রম শায়েখ ওমর ইয়াগিসতানী পর্যন্ত পৌছে। যিনি ছিলেন খাজা আহরারের নানা। হযরত খাজার নানী সাহেবা ছিলেন সাইয়্যিদ বংশীয়। 

তালীম-তরবিয়ত

শৈশব থেকেই তার মাঝে দেখা যায় নির্জনতার প্রবণতা। একাকী নির্জনে থাকা পছন্দ করতেন। তিনি জাহেরী ইলম অর্জন করেন মাওলানা সাদেক হালওয়ানীর কাছ থেকে, যিনি ছিলেন সমকালীন আলেমগণের মাঝে অগ্রগণ্য। একসময় উস্তাদের সঙ্গে তিনি মাওয়ারাউন নাহারে চলে যান। অতঃপর অল্পদিনে অতলনীয় মেধার কারণে বিশিষ্ট আলেমে পরিণত হন।

ইলমী মাকাম

হযরত খাজার ইলমী মাকাম ছিল বহু উঁচু। তার সাথীরা কিতাবের জটিল কঠিন এবারত হল করতে তার কাছে আসত। তিনি তৎক্ষণাৎ সেগুলো হল করে দিতেন।

হকের সন্ধানে

ছাত্রজীবনেই তিনি সমকালীন পীর-মাশায়েখের মজলিসে উপস্থিত হতেন। শিক্ষা সমাপ্তির পর মাওয়ারাউন নাহারের বহু শায়েখের দরবারে হাজির হন। কারো কারো হাতে তওবাও করেন, কিন্তু ইস্তিকামাত নসিব হয়নি। দীর্ঘদিন অলিআল্লাহর তালাশে পেরেশান ছিলেন, নিজের সাধ্য-সামর্থ অনুযায়ী চেষ্টাও করেছেন। এজন্য তিনি সমগ্র মাওয়ারাউন নাহার, বলখ, বদাখশান, সমরকন্দ ও লাহোরের পীর-মাশায়েখগণের সোহবতে যান। লাহোরে থাকাকালীন তার সাক্ষাৎ হয় এক মজযুবের সঙ্গে। মজযুব তাকে গালি দিচ্ছিল, এমনকি পাথর মারছিল, তবুও তিনি তার পিছু ছাড়েননি। অবশেষে মজযুব তার প্রতি সদয় হন এবং তার জন্য বহু দোয়া করেন। 

মায়ের দোয়া

তিনি বলেন, আমার তখনকার অস্থিরতা দেখে আম্মাজান বড়ই দুঃখিত ও ভারাক্রান্ত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত কাকুতি মিনতি করে দোয়া করেন, হে আল্লাহ! আমার সন্তানের উদ্দেশ্য তুমি পূরণ কর। সে তোমার তালাশে সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। প্রায়ই শেষরাতে আম্মাজান আমার জন্য এই দোয়া করতেন। অবশেষে আম্মাজানের হৃদয় নিংড়ানো দোয়া ও মুনাজাতের বরকতে আল্লাহ পাক আমাকে এই মাকাম দান করেছেন। ১

কাঙ্ক্ষিত স্তরে উপনীত

একসময় আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে তিনি স্বপ্নযোগে খাজা নকশবন্দীর যিয়ারত-লাভে ধন্য হন এবং স্বপ্নেই তার হাতে তওবা করার সৌভাগ্য লাভ করেন। তিনি বহু শায়েখের কাছে জানতে পারেন-সর্বোত্তম তরীকা সেটাই যেটা অকাট্টভাবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে। তিনি দু'বছর মুরাকাবা ও জিকিরের পাবন্দি করেন। অবশেষে ৯৯৯ হিজরীতে কাশ্মিরে শায়েখ বাবা অলীর খেদমতে হাজির হন। তখন তার কবুলিয়্যাতের দরজা খুলে যায় এবং আল্লাহ পাকের ফয়েয লাভ শুরু হয়। কিন্তু ১৫ই সফর ১০০১ হিজরীতে হঠাৎ শায়েখ ইন্তিকাল করেন। তখন খাজেগানে নক্শবন্দিয়ার রুহ মুবারক তাকে বিভিন্ন ধরনের তালকীন করতে থাকে। এভাবে তার নিসবতের মাঝে শক্তি পয়দা হয়। ২

উয়াইসিয়্যত

হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ ছিলেন উয়াইসী। তিনি খাজা নক্শবন্দীর রুহানী খলিফা ছিলেন, বরং ছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রুহানী তরবিয়তপ্রাপ্ত। যেমনটা বুঝা যায় তার কতিপয় শেরের মাধ্যমে-

شنیدم کاشف راز نہانی ابو القاسم چراغ گرگانی که بودی درد جان نام اویش که باشد شربی از جام اویش

খাজা আমকাঙ্গীর খেদমতে

হাযারাতুল কুদসের লেখক আল্লামা বদরুদ্দীন সেরহিন্দী খাজা মুহাম্মাদ সিদ্দীক বদখশীর সূত্রে লেখেন, একবার খাজা বাকি বিল্লাহর সামনে তরিকতের পথে দু'টো সমস্যা দেখা দেয়, যেটা কোনোভাবে হল হচ্ছিল না। একদিন তিনি খাজা আহরারকে হালতে ওয়াকিয়ায় বলতে শুনেন, যিনি তোমার সমস্যাদু'টো সমাধান করে দিতে পারবেন তিনিই হবেন তোমার পীর।

খাজা বাকি বিল্লাহ বুখারার বলখে গিয়ে মাওলানা শেরগানীর কাছে সমস্যাদু'টো পেশ করেন। মাওলানা শেরগানী বলেন, বিষয়দু'টো চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে জানা যাবে।

সেই সফরে একদিন স্বপ্নে দেখেন হযরত খাজেগী আমকাঙ্গীকে।

তিনি বলতে থাকেন, اے فرزند ! چشم ما بر سر راه شما است 'হে আমার সন্তান! আমার চোখ তোমার জন্য অপেক্ষমান।' এই ঘটনায় হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ অত্যন্ত খুশি হন এবং আচম্বিতে নিম্নোক্ত শের তার জবানে চলে আসে,

سے گزشتم زغم آشوده که ناگاه زکمیں ہو عالم آشوب نگا ہے سر راہم بگرفت

'আমি চিন্তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ প্রিয়তম চুপিসারে আমার দিকে তাকালেন আর আমি রাস্তায় বসে গেলাম।'

তিনি যখন মাওলানা খাজেগী আমকাঙ্গীর খেদমতে উপস্থিত হন খাজা তাকে দেখেই বলেন, এসো, বয়াত হও! খাজা তখন সমস্যাদু'টো তার জিজ্ঞাসা করা ছাড়াই সমাধা করে দেন। ১

খেলাফতলাভ

খাজেগী আমকাঙ্গী তাকে অত্যন্ত স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। এমনকি নিজের মুরিদগণকে বলেন, খাজার জন্য ঠাণ্ডার ব্যবস্থা করো। তিনি আরজ করেন, ঠাণ্ডার ব্যবস্থা আমি নিজের কাছে রাখি। খাজা আমকাঙ্গী বলেন, আমি জানি, তুমি সবকিছু সঙ্গে রাখ; চেরাগ প্রস্তুত করে, বাতিতে তেল ভরে, বরং বাতি জ্বালিয়ে এনেছ। তার হালাত দেখে খাজা তাকে তিনদিন তিনরাত নিজের সঙ্গে রাখেন। একদম খালওয়াতে মশগুল রাখেন। তিনদিনের মধ্যেই তাকে তরিকতের সুউচ্চ স্তরে পৌঁছে দেন। সবকিছু হয় মূলত আল্লাহ পাকের বিশেষ অনুগ্রহে এবং সিলসিলার শায়েখগণের রুহানী তরবিয়তে। তিনদিন পর তাকে খেলাফত প্রদান করেন যেন তার মাধ্যমে সিলসিলার উন্নতি হয় এবং দিকে দিকে প্রসারিত হয়। একসময় হযরত খাজা তাকে হিন্দুস্তান যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু খাজা বাকি বিল্লাহ বিনয়বশত ওজরখাহি করেন। তখন হযরত খাজা বলেন, ইস্তিখারা করে দেখ।

খাজা বাকি বিল্লাহ বলেন, শায়েখের নির্দেশে আমি ইস্তিখারা করি।

ইস্তিখারার মাঝে দেখি, একটা সুদর্শন তোতাপাখি গাছের ডালে বসা। আমি মনে মনে বলি, পাখিটি যদি উড়ে এসে আমার হাতে বসে তাহলে মনে করব এই সফর আমার জন্য কল্যাণকর। এটা কল্পনা করতেই পাখিটি উড়ে এসে আমার হাতে বসল। পরে আমি আমার লালা পাখিটির মুখে দিলাম আর পাখিটি আমার মুখে দিল চিনির দানা। পরের দিন আমি ইন্তিখারার ফলাফল খাজেগী আমকাঙ্গীর কাছে ব্যক্ত করলাম। শুনে তিনি বলেন, তোতা তো হিন্দুস্তানের পাখি, হিন্দুস্তানে তোমার মাধ্যমে একজন বুযুর্গের আবির্ভাব ঘটবে। আর তুমিও তার মাধ্যমে হবে সৌভাগ্যবান। ১

আত্মমর্যাদাবোধ

হযরত খাজেগী আমকাঙ্গীর কতিপয় পুরনো সাথী যারা দীর্ঘদিন থেকে হযরতের সঙ্গে ছিল তারা যখন জানতে পারল, খাজা বাকি বিল্লাহকে খেলাফত ও এজাযত দিয়ে হিন্দুস্তানে পাঠানো হচ্ছে, তারা অভিমানে শোরগোল শুরু করল। হযরত খাজেগী তাদের অভিমান জানতে পেরে বলেন, এই যুবক তো তাকমীলে পৌঁছে গেছে, আমি শুধু তার হালতের এসলাহ করেছি। কেউ এমন হালতে এলে তাকে তেমনি দ্রুত বিদায় দেয়া হবে। এই যুবকের মাধ্যমে হিন্দুস্তানে সিলসিলায়ে নক্শবন্দিয়ার অত্যন্ত রওনক হবে। আর উঁচু হিম্মত সালেকগণ তার মোবারক তরবিয়তের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে তাকমীল পর্যন্ত।

বিনয় ও নম্রতা

হিন্দুস্তানে রওয়ানা হওয়ার সময় হযরত খাজেগী আমকাঙ্গী বলেন, আমার সঙ্গে ওয়াদা করো যে, যদি কেয়ামতের দিন আল্লাহ পাক তোমাকে নৈকট্য দান করেন তাহলে আমার জন্যও সুপারিশ করবে। হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, এই আশা তো আমার নিজের। মাওলানা আমকাঙ্গী তখন বলেন, আচ্ছা, উভয় পক্ষ থেকে এই চক্তি হোক। তখন উভয়ে এই চুক্তিতে আবদ্ধ হন যে, যেই আল্লাহর কাছে নৈকট্য পাবে সেই অন্যজনের জন্য সুপারিশ করবে। দেখুন, কী অনুপম বিনয়!

হিন্দুস্তানে আগমন

হিন্দুস্তানে পৌঁছে তিনি প্রায় বছরখানিক লাহোরে ছিলেন।

সেখানকার বহু আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখ তার ভক্ত হয়ে যায়। এর পর তরীকায়ে নক্শবন্দিয়ার বুযুর্গদের ইশারায় তিনি দিল্লি চলে যান। দিল্লি মূলত পীর-মাশায়েখের মাযার ও বুযুর্গদের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে যমুনা নদীর তীরে কেল্লায়ে ফিরোজীতে তিনি অবস্থান করেন। প্রায়ই এশার নামাজের পর মুরাকাবা করতেন। আর এক মুরাকাবায় ভোর হয়ে যেত।

হালাত ও মাকামাত

খাজা আমকাঙ্গী ছিলেন অত্যন্ত উঁচু স্তরের সাহেবে যওক বুযুর্গ। অতি বিনয়ী ও নম্রভদ্র। নিজের হালত সর্বদা গোপন রাখতেন। নিজেকে কখনো মাকামে এরশাদের উপযুক্ত মনে করতেন না। কেউ বাতেনী ইস্তেফাদার জন্য এলে বলতেন, আমার কাছে তো কিছুই নেই, তুমি অন্য কারো কাছে রুজু কর। কোনো বুযুর্গ পেলে আমাকেও জানাবে।

তার তরীকা ছিল গুমনাম হয়ে থাকা এবং নিজের হালাত গোপন রাখা। তবুও দিল্লি ও আশপাশের বহু পীর-মাশায়েখ নিজেদের খানকা ছেড়ে তার খেদমতে এসে উপস্থিত হতে থাকেন। কেউ বয়াতের জন্য হাজির হলে ফিরিয়ে দিয়ে বলতেন, তুমি অন্য কোথাও তালাশ কর। কিন্তু আন্তরিক বিশ্বাস নিয়ে আসা ভক্তরা তার দরবার ছেড়ে যেত না। অবশেষে বাধ্য হয়ে তিনি কবুল করতেন। তার খলিফা খাজা হুসামুদ্দীন বলেন, আমি যখন সর্বপ্রথম হযরত খাজার খেদমতে উপস্থিত হই, তিনি এমনভাবে নিজের অপারগতা প্রকাশ করেন যে, বাধ্য হয়ে আমি অন্য মুরশিদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ি। একবার আগ্রার এক গলি দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ গলি থেকে আওয়াজ এলো, কেউ শেখ সাদীর এই কবিতা পড়ছে,

تو خوابی آستین افشان و خواهی دامن اندرکش چیه مگس هرگز نخواهد رفت از دکان حلوائی

এই শের শুনতেই আমি দিল্লি ফিরে এলাম এবং হযরত খাজাকে পীড়াপীড়ি করে সিলসিলায়ে নক্শবন্দিয়াতে দাখেল হয়ে গেলাম।

বুযুর্গির দাবী দূরে থাক আগন্তুকদের খেদমত ও মনতুষ্টিতে তিনি মশগুল হয়ে যেতেন। কোনো প্রয়োজনে বা সূক্ষ্ম মাসআলা বলার জন্য কেবল মুখ খুলতেন। শ্রোতাদের দিক-নির্দেশনা দিতেন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে। সাথীদের নিষেধ করতেন তার সম্মানার্থে দাঁড়াতে। নিজেকে তাদের অনুরূপ মনে করতেন। সর্বক্ষেত্রে নিজেকে তাদের সমতুল্য ভেবে আচরণ করতেন। অত্যধিক বিনয় ও নম্রতার দরুণ মাটিতে বসে থাকতেন।

সাথীরা হাত বেঁধে নিচ দষ্টিতে অতি আদবের সঙ্গে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। কারো সাহস ছিল না তার দিকে চোখ তুলে তাকায়। তিনিও কারো দিকে তাকাতেন না। হঠাৎ কারো ওপর দৃষ্টি পড়ে গেলে সে বেহুঁশ হয়ে যেত। ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও উদারপ্রাণ। নিজের দোষত্রুটির প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখতেন। প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। ১

রুহানী হালত ও কাইফিয়্যাত

তার রুহানী হালত ও কাইফিয়‍্যাত ছিল অতি উঁচু স্তরের। মানুষকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা ছিল প্রবল। যার ওপর দৃষ্টি দিতেন তার হালত পরিবর্তন হয়ে যেত। প্রথম সোহবতে যওক-শওক হাছিল হয়ে যেত।

আহলে মারেফত হলে হাছিল হয়ে যেত রুহানী কাইফিয়্যাত। প্রথম তাওয়াজ্জুহ ও তালকীনে সালেকদের কলব জারি হয়ে যেত। মাখলুকের প্রতি তার ফয়েয ও মহব্বত এত প্রবল ছিল যে, একবার প্রচণ্ড শীতের রাতে বিছানা ছেড়ে কোনো কাজে বাইরে গেছেন। এসে দেখেন লেপের নিচে বিড়াল শুয়ে আছে। বিড়ালকে সরিয়ে দিতে তার মন চাইল না। ফলে সকাল পর্যন্ত এভাবে বসে থাকলেন, তবুও বিড়ালের কষ্ট হবে ভেবে তাড়াননি।

মানবতা ও উদারতা

লাহোরে অবস্থানকালে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি কিছুই খেতেন না। তার কাছে যে খাবার আসতো সেটা গরীব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। একবার লাহোর থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে এক মাজুরকে দেখে সওয়ারিতে উঠিয়ে নেন এবং গন্তব্যে পৌঁছে দেন। আর নিজে যান পায়ে হেঁটে। তবে কেউ যেন চিনে না ফেলে সেজন্য চেহারা ঢেকে রাখেন ভুল স্বীকার করতে বা নিজেকে গোনাহগার আখ্যা দিতে সামান্য দ্বিধা করতেন না। সাথীসঙ্গী দূরে থাক জনগণ থেকেও নিজেকে বিশিষ্ট মনে করতেন না।শোনা যায়, তার পড়শী এক যুবক ছিল দুর্বত্ত শ্রেণীর। সব রকম অন্যায় অনাচার ও পাপাচার করত। কিন্তু জেনেশুনে তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন। একবার তার মুরিদ খাজা হুসামুদ্দীন দেহলভী শাসকের কাছে যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। ফলে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায়। জানতে পেরে শায়েখ খাজা হুসামুদ্দীনের ওপর খুবই অসন্তুষ্ট হন। তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, হযরত। যুবকটি বড়ই দুর্বৃত্ত। একথা শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, হ্যাঁ, আপনি তো বড় মুত্তাকী ও পরহেযগার মানুষ, তাই আপনার চোখে তার খারাবি ধরা পড়ে গেছে। আমি কিন্তু নিজেকে তার চেয়ে উত্তম মনে করি না, তাই তার বিরুদ্ধে শাসকের কাছে অভিযোগও করি না। পরে তিনি নিজ চেষ্টায় যুবকটিকে ছাড়িয়ে আনেন। এতে যুবকটি ভালো হয়ে যায় এবং মুত্তাকী ও পরহেযগার হয়ে যায়।

কোনো মুরিদ কোনো অন্যায় করলে তিনি বলতেন, এটা আমারই ভুল, যা ওর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এবাদত ও মুয়ামালাতের ক্ষেত্রে আজীমতের ওপর আমল করতেন। প্রথম দিকে ইমামের পিছনে সুরা ফাতেহা পড়তেন। কারণ এ ব্যাপারে বহু সহিহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

এখানে সিন্দুর এক বিন্দুর মত তার ফায়াযেল ও কামালতের ঝলকমাত্র উল্লেখ করা হলো। অন্যথায় তার গুণাবলী ও কামালাত অনেক। তাই তো অল্প সময়ে বহু মানুষকে বাতেনী ফয়েয পৌঁছাতে পেরেছেন। হিন্দুস্তানে এই সিলসিলা তার মাধ্যমেই জারি হয়েছে। তার পূর্বে এই সিলসিলার কথা কেউ জানত না। ১

শায়েখ মুহাম্মাদ ইবনে ফযলুল্লাহ বুরহানপুরী বলেন, ওয়াজ-নসিহতে তার তুলনা কেউ ছিল না। মাত্র তিন চার বছরে তার ফু্যুয ও বারাকাত সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে যায়। এর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়

 [ ১. হিন্দুস্তানে নকশবন্দিয়া সিলসিলা দু'ভাবে পৌঁছেছে। প্রথমত আমীর আবুল আলা আকবরাবাদীর মাধ্যমে। যিনি নিজের চাচা আব্দুল্লাহ আহরার থেকে নক্শবন্দিয়া তরিকায় খেলাফত ও এজাযত পেয়েছেন। তবে এই তরিকায় চিশতিয়া ও নক্শবন্দিয়া একসঙ্গে মিলে গেছে। কালপী, মারহেরা ও দানাপুরে এই সিলসিলা তার মাধ্যমে প্রসার লাভ করেছে। দ্বিতীয়ত হযরত খাজা বাকি বিল্লাহর মাধ্যমে। হিন্দুস্তানে মূলত তার আগমনের মাধ্যমে এবং হযরত মুজাদ্দিদ সাহেব এই সিলসিলায় প্রবেশ করার কারণে হিন্দুস্তানে এর প্রচার-প্রসার হয়। পরে এই সিলসিলা সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে যায়। (আস সাকাফাতুল ইসলামিয়া ফিল হিন্দ, মাওলানা আব্দুল হাই)]

মোল্লা হাশেম কাশমির 'যুবদাতুল মাকামাত' গ্রন্থে। তিনি মোট চল্লিশ বছর হায়াত পেয়েছেন। কিন্তু হিন্দুস্তান ছিলেন মাত্র চার বছর। অথচ এই সংক্ষিপ্ত সময়ে তার মুরিদরা কামালাতের সুউচ্চ স্তরে পৌঁছে গেছেন। এমনকি তারা অতীতের বহু সিলসিলা মিটিয়ে দিয়েছেন। আর নকশবন্দিয়া তরীকা প্রবল হয়ে গেছে সব তরীকার ওপর।

মুহাম্মাদ ইবনে ফযলুল্লাহ মুহিব্বী 'খোলাছাতুল আসার' গ্রন্থে লেখেন, হযরত শায়েখ বাকি বিল্লাহ ছিলেন প্রচণ্ড তাসাররুফের অধিকারী আল্লাহ পাকের জ্যোতি। জাহেরী ও বাতেনী ইলমের ধারক বাহক। তবে কিছুটা নিশ্চুপ ধরনের বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তার স্বভাব ছিল এতটা কোমল যে নিজেকে কারো চেয়ে বিশিষ্ট মনে করতেন না। সাথী সঙ্গীদেরকে নিষেধ করে দিয়েছেন তার সম্মানার্থে দাঁড়াতে। সুলুকের সাধারণ তালকীন করতেন।

মোল্লা মুহিব্বী আরো বলেন, তার থেকে বহু তাসাররুফ প্রকাশ পেত। যার ওপর দৃষ্টি পড়ত বা যে সিলসিলায় দাখেল হতো তার ওপর ফানায়িয়্যাত প্রবল হয়ে যেত। যদিও তরীকার সঙ্গে তার তেমন মুনাসাবাত হয়ে সারেনি। লোকেরা তার দরবারে পড়ে থাকত বেহুঁশের মত। অনেকের নিকট প্রথম দফায় জাহের হয়ে যেত আলমে মালাকুত। এটা মূলত গায়েবী আকর্ষণের ফল।

তার মুরিদগণের মাঝে অন্যতম হলেন তরীকায়ে মুজাদ্দেদিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ইমাম রাব্বানী, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী। হযরত শায়েখ তাজুদ্দীন ইবনে সুলতান উসমান সাম্বলী, শায়েখ হুসামুদ্দীন ইবনে শায়েখ নেজামুদ্দীন বদখশী, শায়েখ ইলাহদাদ দেহলভীর মত জগদ্বিখ্যাত পীর-মাশায়েখগণ।

তার রচিত বিরল কিছু রেসালা, মূল্যবান মাকতুবাত ও স্বচ্ছ কবিতা রয়েছে। তন্মধ্যে 'সিলসিলাতুল আহরার' অন্যতম। এতে তিনি ফার্সিতে নিজের ইরফানী রুবাইয়াতের ব্যাখ্যা করেছেন।

ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী :

যদিও কোনো তালেবকে তিনি তাৎক্ষণিক সিলসিলায় দাখেল করতেন না, তবে ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানী শেখ আহমদ সেরহিন্দীর ব্যাপারটি ছিল ভিন্ন। তিনি হযরত খাজার খেদমতে আসতেই খাজা তার সঙ্গে অত্যন্ত স্নেহের আচরণ করেন এবং তৎক্ষণাৎ জোর করে তাকে নক্শবন্দীয়া তরীকায় দাখেল করে নেন।

ইন্তিকাল

হযরত খাজা বাকি বিল্লাহর বয়স যখন চল্লিশ বছর তখন তিনি একদিন স্ত্রীকে বলেন, আমার বয়স চল্লিশ হলে একটা বিরাট ঘটনা ঘটবে। পরে একদিন বলেন, আমাকে স্বপ্নে বলা হয়েছে, যে কাজের জন্য তোমাকে পাঠানো হয়েছে সেটা পূর্ণ হয়ে গেছে। আরেকদিন বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই সিলসিলায়ে নকশবন্দিয়ার একজন বুযুর্গ মারা যাবেন, যিনি কুতুবে যমান। ১০১২ হিজরীর জুমাদাস সানীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। প্রচণ্ড রোগশোকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। অবশেষে ১০১২ হিজরীর ২৫শে জুমাদাস সানী শনিবার আল্লাহ পাকের জিকির করতে করতে ইন্তিকাল করেন।

দিল্লি শহরের বাইরে আজমীর গেটের কাছে কদমে রসুলের সান্নিকটে তার মাযার অবস্থিত। তার অসিয়্যত মোতাবেক কবরে গম্বুজ নির্মণ করা হয়নি। শুধু একটা উঁচু চত্বর নির্মাণ করা হয়, যেটা অত্যন্ত শানদারভাবে তৈরী হয় খাজা হুসামুদ্দীনের আন্তরিক চেষ্টায়।

যুহুদ ও নির্মোহতা

তার যুহুদ ও নির্মোহতা ছিল এমন যে, তার মজলিসে কোনো দুনিয়াবী কথাবার্তা হতো না। সাথী-সঙ্গীদের জন্য অভাব-অনটন ও দুঃখ-দারিদ্র ছাড়া অন্যকিছু চাইতেন না। যুহুদ ও অল্পেতুষ্টি ছাড়া কিছুই কামনা করতেন না। তার বহু ধনী ভক্ত দরবারের ফকীরদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করে দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি তা কবুল করেননি। তিনি বলতেন, আমাদের মাধ্যমে যে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করবে, তার জেনে রাখা উচিত আমাদের সঙ্গে তার মহব্বত কম।

লক্ষ রুপিয়া ফিরিয়ে দিলেন :

একবার উজির খান খানান দরবেশদের হজের জন্য তার কাছে এক লক্ষ রুপিয়া পাঠান। তিনি রুপিয়া ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, মুসলমানদের এতগুলো অর্থ আমরা আমাদের জন্য খরচ করতে চাই না।

তাসাররুফাত

একবার এক খতিব সাহেব মিম্বরে বসা ছিলেন। ইতিমধ্যে হযরত খাজা সামনে আসেন। হঠাৎ খতিব সাহেবের দৃষ্টি পড়ে খাজার চেহারার জামালের ওপর। ফলে খতিব সাহেবের দেহে কাঁপনি শুরু হয়ে যায়, কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। এম কি একসময় মিম্বর থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যান।

খাজার দৃষ্টি

একবার একজন সেনা অফিসার হযরত খাজার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আসে। খাদেম অফিসারের ঘোড়া ধরে রেখেছিল। হযরত খাজা তখন মসজিদ থেকে বের হন। হঠাৎ তার জ্যোতির্ময় দৃষ্টি পড়ে খাদেমের ওপর। ফলে খাদেম বেঁহুশ হয়ে পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর উঠলে আবারো পড়ে যায় এবং গড়াগড়ি খেতে থাকে। রাতের প্রথম প্রহর কেটে যায় এভাবে চরম অস্থিরতায়। পরে খাদেম পাগলের মত জঙ্গলের দিকে চলে যায়। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

খাজার আত্মবোধ

একজন চিশতী শায়েখের ছেলে হযরত খাজার হাতে বয়াত হয়। ঘটনাক্রমে সে অসুস্থ হয়ে যায় এবং মৃত্যুশয্যায় শায়িত হয়। বাঁচার একদম আশা নেই। তার অসুস্থতার সংবাদ কেউ হযরত খাজাকে দিল। খাজা বলেন, তার মনে এ খেয়াল এসেছে যে, এই তরীকা ছেড়ে তার পিতৃপুরুষের তরীকায় বয়াত হওয়ার উচিত ছিল। এটা আমার কাছে জাহের হয়ে যায়। ফলে আমার আত্মমর্যাদায় লাগে। এটাই তার অসুস্থ হওয়ার কারণ। সেই লোক শায়েখের ছেলেকে বিষয়টা অবহিত করল। তিনি বিষয়টা সত্যায়ন করেন এবং তওবা করে অনুতাপ প্রকাশ করেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তিনি আরাম বোধ করেন।

পড়শীর প্রতি সহানুভূতি

এক হাকিম সাহেবের নায়েব পড়শীর ওপর ভীষণ জুলুম করত। এমনকি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে চাইত। হযরত খাজা সাহেব তাকে প্রায়ই বোঝাতেন। একদিন প্রবল আবেগে বলেন, এই মহল্লায় একজন ফকীর থাকেন, তার উছিলায় তাকে ক্ষমা করে দাও। কিন্তু নায়েব সাহেব মানেননি। পরে খাজা বলেন, আমাদের খাজাগণ অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল হয়ে থাকেন। শুধু তোমার নয়, তোমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জীবনহানি হবে। কিন্তু নায়েব একথারও পরোয়া করেননি।১ দু'তিন দিন যেতেই নায়েব সাহেবের ওপর চুরির অপবাদ আসে। ফলে তাকে আত্মীয়-স্বজনসহ হত্যা করে দেয়া হয়।

তাফরীদ

একবার হযরত খাজা তার বিশিষ্ট খলিফা শায়েখ তাজুদ্দীনকে বলেন, তাজ! আমার ওপর এত পরিমাণ ওয়ারেদাত, ফুতুহাত ও আনওয়ার বর্ষণ হয় যে, যদি সমুদ্র কালি হয়ে যায়, তবুও তা লিখে শেষ করা যাবে না। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য লোক দেখানো নয়,

طلب بے چوں و مطلب هیچ گونه و نه آن را شبه و ازین را نمونه

এসত্ত্বেও তাফরীদ তার ওপর এত প্রবল ছিল যে, মজলিসে নিজের বুযুর্গির কথা মনে থাকত না। শুধু দু'তিন বছর তরবিয়তে মশগুল ছিলেন। এরপর সম্পূর্ণ একাকী হয়ে যান। নির্জনতা অবলম্বন করতেন। জামাতে নামাজ পড়া ছাড়া কোথাও যেতেন না।

খাবারের বিষয়ে সতর্কতা

খাবারের ব্যাপারে সতর্কতা ছিল তার সীমাহীন। হাদিয়া ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতেন না। অথচ হাদীসে এসেছে, نحن لا نرد الهدية 'আমরা হাদিয়া ফিরিয়ে দেই না।' তিনিও হাদিয়া ফিরিয়ে দিতেন না, তবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতেন না। বাবুর্চিকে অত্যন্ত তাকীদের সঙ্গে বলে দিতেন, খাবার পাকানোর সময় বা-অজু থাকবে আর কলব হুজুর রাখবে। দুনিয়াবী কথাবার্তা বলবে না।

তিনি বলতেন, যে খাবার হুজুরে কলব ছাড়া খাওয়া হয় তাতে ধোঁয়া পয়দা হয়; যেটা ফয়েযের রাস্তা বন্ধ করে দেয়।

তালকীনে তরীকত

তিনি যাদেরকে সিলসিলায় দাখেল করতেন তাদের কাউকে নফি ইসবাতের জিকির দিতেন। কাউকে দিতেন শুধু ইসবাতের জিকির; শুধু আল্লাহু আল্লাহু করতে বলতেন। তালীমের সঙ্গে তাওয়াজ্জুহও দিতেন। ফলে তৎক্ষণাৎ তার দিল জাকের হয়ে যেত। সে অবস্থায় কখনো তার সামনে উন্মোচিত হয়ে যেত আলমে আমছাল, আলমে আরওয়াহ ও আলমে মাআনী। কেউ কেউ তাওয়াজ্জহের কারণে বেহুঁশ হয়ে যেত। কয়েক দিন পর হুঁশ ফিরে আসত।

আজমত ও কামাল


তার মাকাম, মর্যাদা ও কামালাত বোঝার জন্য শুধু এতটুকু যথেষ্ট যে, তিনি দিল্লিতে মসনদে এরশাদে ছিলেন মাত্র দু'তিন বছর। এতটুকু সময়ে এত মানুষ তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে যেটা অকল্পনীর। বিশেষত ইমামে রাব্বানী হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানীর মত মহান শায়েখ, যার জন্ম ও খাজা বাকি বিল্লাহর জন্ম একই বছর। উভয়ে ৯৭১ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। শায়েখের নেক দৃষ্টির বদৌলতে তিনি অতি দ্রুত সুলুকের পথ অতিক্রম করেন এবং তাকমীল ও এরশাদের মাকামে পৌঁছে যান। এমনটা আর কারো ক্ষেত্রে হয়নি। তার মাধ্যমে হিন্দুস্তানে নক্শবন্দিয়া তরীকার ব্যাপক প্রচার-প্রসার হয়। এই সিলসিলার মহান বুযুর্গগণ দ্বীনের এমন খেদমত করেছেন যার মাধ্যমে ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন হয়ে গেছে। দীনে হকের জন্য তাদের মুজাহাদার কথা স্বার্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ইতিহাসের পাতায়।

আল্লাহ পাক হযরত খাজাকে ইমামে রাব্বানী হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানীর তরবিয়ত ও তাকমীলের জন্য নির্বাচন করেছেন। কেননা এর পর তিনি নিজের মুরিদদের তরবিয়তের দায়িত্ব অর্পণ করেন ইমামে রাব্বানীর ওপর। অবশেষে চল্লিশ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন।

অনুপম দৃষ্টান্ত

ইসলামের তাসাওউফের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত আছে কি না জানা নেই! এত অল্প বয়সে কামালতের সুউচ্চ স্তরে শুধু নিজেই অধিষ্ঠিত ছিলেন না, বরং নিজের মুরিদদেরও সেই স্তরে পৌঁছে দিয়েছেন।

মামুলাত

তিনি সর্বদা বা-অজু থাকতেন। এশার নামাজ আদায় করে কামরায় চলে যেতেন। পরে কিছুক্ষণ মুরাকাবা করতেন। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দুর্বল হয়ে গেলে বা ক্লান্তি অনুভব করলে করতেন নতুন অজু। দু'রাকাত নফল পড়ে পুনরায় মুরাকাবায় চলে যেতেন। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আবারো শিথিল হয়ে গেলে পুনরায় অজু করতেন। এভাবে সমস্ত রাত কাটিয়ে দিতেন। আল্লাহ পাকের ওপর তার রেজা ও তাসলীম এমন ছিল যে, ঘরের পরিচ্ছন্নতা, মেরামত ও আলো জ্বালানোর কথাও বলতেন না কাউকে। 

অমূল্য বাণী :

১. তাওহীদ

হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ বলেন, তাওহীদ হাছিল করা উচিত। মুহাক্কিক মুতাকাল্লিমদের মতে তাওহীদ হলো, لا مؤثر في التوحيد الا الله 'একমাত্র আল্লাহ তায়ালা ছাড়া সৃষ্টিজগতে অন্যকোনো মুয়াসসির নেই।' অর্থাৎ নিজের সমস্ত শক্তি আল্লাহর তায়ালার ওপর ন্যস্ত করা এবং নিজেকে সেই কুদরত থেকে রিক্ত মনে করা।

অবশ্য পরবর্তী যুগের কতিপয় উলামায়ে কেরাম বান্দার জন্যও মোটামুটি কুদরত সাব্যস্ত করেন। তাদের মতে তাওহীদ হলো, لا معبود الا لله।। কিন্তু সঠিক মাযহাবমতে لا مؤثر في الوجود الا الله 'সৃষ্টিজগতে একমাত্র আল্লাহই মুয়াসসির।' এটাই সঠিক। সুফিয়ায়ে কেরাম কর্ম ও কুদরতকে যেভাবে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করেন তেমনি বাকি সাত ছিফাতে ইলাহিয়্যাকেও আল্লাহ তায়ালার দিকে সম্পৃক্ত করেন তথা বাকি, ইলম, হায়াত, সামা, বাছার, ইরাদা ও কালামকে।

২. ঈমান

হযরত খাজা বাকি বিল্লাহ বলেন, অধিকাংশ মুহাক্কিক আলেমের মতে যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালা ও তার রসুলের ওপর তাহকীকী ঈমান আনবে তার ঈমান কখনো প্রত্যাখ্যাত হবে না। আর যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর মরদুদ হয়ে যাবে, এটা একথার প্রমাণ যে তার ঈমান তাহকীকী ছিল না, বরং তাকলীদী ছিল। কারণ তাহকীকী ঈমান কখনো মরদুদ হয় না।

৩. তরীকায়ে নক্শবন্দিয়া

হযরত বলেন, আমাদের তরীকার কোনো দরবেশের সঙ্গে যদি কারো মহব্বত হয়ে যায়, যার মাঝে আকাবিরের গুণাবলী পাওয়া যায়,শায়েখের অনুপস্থিতিতেও তার সুরত সালেকের জেহেনে হাজির থাকে, তাহলে তাকে তরীকায়ে রাবেতা অবলম্বন করা উচিত। তবে তালেবকে এ বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত যে, তার দ্বারা যেন এমন কোনো কাজ প্রকাশ না পায় যার ফলে তার প্রতি দরবেশের ঘৃণা সৃষ্টি হয়। তালেবের উচিত নিজের উদ্দেশ্য অন্তর থেকে বের করে দেয়া এবং তার উদ্দেশ্য অন্তরে প্রতিষ্ঠা করা।

৪. তরীকায়ে সিদ্দীকিয়া

হযরত বলেন, এই তরীকায় সুলুকের বুনিয়াদ হলো উভয় পক্ষের সম্পর্কের ওপর। যেমনিভাবে তুলা আতশি কাচের সাহায্যে সূর্য থেকে আলো গ্রহণ করে। ঠিক তেমনি মানুষের বাতেন শায়েখের মাধ্যমে আল্লাহ পাকের আলো গ্রহণ করে। কেননা প্রতিটি তালেব ও দরবেশের দৃষ্টান্ত হলো, তুলা, আতশি কাচ ও সূর্য।

এই তরীকা মূলত হযরত আবু বকর ছিদ্দিক রা.-এর মাধ্যমে এসেছে। আর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে তার মহব্বত ছিল চূড়ান্ত স্তরের। এ পথে তিনি ফয়েয হাছিল করেছেন।

তিনি আরো বলেন, হযরত খাজেগানদের তরীকা যা হয়রত সিদ্দীকে আকবরের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেটা এই নিসবতে মহব্বতের ভিত্তিতে। কেননা তাদের নীতি হলো, এই নিসবতের হেফাজত করা। জাজ) ৫৫

৫. জযবা

হযরত বলেন, আমাদের জিকিরের তরীকায় জযবা পয়দা হয়। আর জযবার সাহায্যে সমস্ত মাকামাত সহজে হাছিল হয় এবং ইস্তিকামাতও লাভ হয়।

৬. মুরাকাবা

মুরাকাবা বলা হয় নিজের কর্ম ও ক্ষমতা থেকে বেরিয়ে আল্লাহ পাকের ফয়েষের অপেক্ষায় থাকা।

৭. দাওয়ামে মুরাকাবা

হযরত বলেন, দাওয়ামে মুরাকাবা বড় নেয়ামত। এর মাধ্যমে অন্তরে কবুলিয়্যাত পয়দা হয়। আর মানুষের অন্তরে কবুলিয়্যাত আল্লাহ পাকের কবুলিয়্যাতের নমুনা।


৮. জিকির

হযরত বলেন, জিকির বলা হয় গাইরুল্লাহর স্মরণ থেকে বেরিয়ে আসা। আর কামালে জিকির হলো স্বয়ং নিজের স্মরণ থেকে বেরিয়ে আসা।

৯. তরীকার ভিত্তি তিনটি জিনিস

হযরত বলেন, আমাদের তরীকার ভিত্তি তিনটি জিনিসের ওপর। প্রথমত আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকীদার ওপর অবিচল থাকা। দ্বিতীয়ত শায়েখকে হালত জানাতে থাকা। তৃতীয়ত এবাদত করতে থাকা।

যদি কারো মাঝে তিনটি বিষয়ের কোনো একটিতে ত্রুটি থাকে তাহলে সে আমাদের তরীকার অন্তর্ভক্ত নয়। আমরা ইজ্জতের পর যিল্লত এবং কবুলের পর প্রত্যাখ্যান থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।

১০. তাওয়াক্কুল

হযরত বলেন, তাওয়াক্কুল হলো উপায়-উপকরণ না দেখা। আর কামালে তাওয়াক্কুল হলো, উপায়-উপকরণে থেকে সম্পূর্ণরূপে হাত গুটিয়ে নেয়া। তিনি আরো বলেন, কানায়াত হলো, অতিরিক্ত উপায়-উপকরণ ত্যাগ করা, প্রয়োজনের ওপর ক্ষান্ত করা; ভালো খাবার, ভালো কাপড় ও ভালো বাড়ি থেকে বিরত থাকা। আর কামালে কানায়াত হলো, শুধু আল্লাহ পাকের মহব্বতের ওপর ক্ষান্ত করা এবং প্রশান্তি অনুভব করা।

১১. রেজায়ে এলাহী

রেজায়ে এলাহী হলো, নিজের রেজা তরক করা এবং আল্লাহ পাকের রেজায় মশগুল থাকা।

১২. তাওয়াজ্জুহ

তাওয়াজ্জুহ হলো, সমস্ত খাহেশাত থেকে বের হয়ে যাওয়া এবং সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর অভিমুখী হওয়া।

১৩. সবর

সবর হলো নফসের সাধ-আহলাদ তরক করা এবং প্রিয় জিনিস থেকে বিরত থাকা।

১৪. তওবা

তওবা হলো গোনাহ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। কেননা গোনাহই মূলত প্রধান পর্দা। এজন্য মানুষ থেকে কলবী বিচ্ছিন্নতা তওবার কামাল।

 

 

রেফারেন্স: নক্শবন্দিয়া তরীকার মাশায়েখ

Sufi.News Portal (Sufibadi.com) is a digital sanctuary spreading Sufi wisdom, human love, and interfaith harmony. We highlight saint biographies, sacred traditions, and spiritual practices to foster inner peace and global unity. ​Join our community grounded in compassion and unconditional love! ​📞 Contact: +880-1840624624 (BD) / +91-9332594925 (IN) | Email: moinur.chisty@sufibadi.com | Web: Sufibadi.com Email: sufibadillc@gmail.com

Comments

https://sufi.news/assets/images/user-avatar-s.jpg

0 comment

Write the first comment for this!