হযরত_ফরিদউদ্দীন_আত্তার (রহ:)
হযরত ফারীদুদ্দীন আত্তার নিশাপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাসাউফের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, চিন্তাবিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম।

হযরত_ফরিদউদ্দীন_আত্তার_নিশাপুরী_রহমাতুল্লাহি_আলাইহি

হযরত ফারীদুদ্দীন আত্তার নিশাপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাসাউফের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, চিন্তাবিদ ও আওলিয়ায়ে কিরাম। তাঁকে নিয়ে হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রূমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন:
"আত্তার ইশকের সাতটি নগর অতিক্রম করেছেন, আর আমরা এখনো প্রথম গলির মোড়েই দাঁড়িয়ে আছি।"
১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
পূর্ণ নাম: আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবন আবু বকর ইবরাহিম
উপাধি: ফারীদুদ্দীন
তাখাল্লুস: আত্তার
জন্ম: আনুমানিক ১১৪৫ খ্রিস্টাব্দ, নিশাপুর, খোরাসান (বর্তমান ইরান)
২. "আত্তার" উপাধির কারণ
তাঁর পিতা ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ হাকিম, ঔষধ প্রস্তুতকারক ও আতর ব্যবসায়ী। পিতার ইন্তিকালের পর তিনি সেই ঔষধের দোকান পরিচালনা করেন।
ফারসি ভাষায় "আত্তার" বলতে ঔষধ ও সুগন্ধি প্রস্তুতকারককে বোঝায়। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কষ্ট দেখে তাঁর অন্তরে দুনিয়ার নশ্বরতার অনুভূতি জাগে এবং ধীরে ধীরে তিনি আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
৩. আধ্যাত্মিক জীবনের সূচনা
ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে, একদিন এক দরবেশ তাঁর দোকানে এসে দাঁড়ান।
হযরত আত্তার বলেন, "আপনি এভাবে কী দেখছেন? চলে যান।"
দরবেশ উত্তর দিলেন, "আমি তো চলে যাব, কারণ আমার কাছে এই ছেঁড়া কাপড় ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু আপনার চিন্তা হচ্ছে, এত সম্পদ রেখে আপনি কীভাবে এই দুনিয়া ছাড়বেন?"
হযরত আত্তার বললেন, "আমিও তোমার মতোই মৃত্যুবরণ করব।"

দরবেশ বললেন, "আপনি কি সত্যিই তা পারবেন?"
এরপর তিনি নিজের ভিক্ষার পাত্র মাটিতে রেখে মাথা তার ওপর রাখলেন, "আল্লাহ" উচ্চারণ করলেন এবং ইন্তিকাল করলেন।
এই ঘটনা হযরত আত্তারের জীবন আমূল বদলে দেয়। তিনি সম্পদ দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর পথে আত্মনিয়োগ করেন।
৪. শিক্ষা, সফর ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থ
পরবর্তীতে তিনি বাগদাদ, বসরা, কুফা, মক্কা মুকাররমা, মদিনা মুনাওয়ারা, দামেস্ক এবং হিন্দুস্তানসহ বহু অঞ্চল সফর করেন এবং বহু বুযুর্গের সান্নিধ্যে আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ:
১. মানতিকুত তায়র (পাখিদের সম্মেলন)
এটি তাসাউফের এক অনন্য রূপকগ্রন্থ। এতে পাখিদের সিমুর্গের সন্ধানে সাতটি আধ্যাত্মিক উপত্যকা অতিক্রম করার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।
২. তাযকিরাতুল আওলিয়া
এ গ্রন্থে হযরত হাসান বসরী, হযরত রাবেয়া বসরী, হযরত মনসুর হাল্লাজসহ বহু আওলিয়ায়ে কিরামের জীবনী ও বাণী সংকলিত হয়েছে।
৫. শাহাদাত
ইন্তিকাল/শাহাদাত: এপ্রিল, ১২২১ খ্রিস্টাব্দ
চেঙ্গিস খানের পুত্র তোলুই নিশাপুর আক্রমণ করলে ব্যাপক গণহত্যা সংঘটিত হয় এবং হযরত আত্তারও বন্দী হন।
একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে:
এক ব্যক্তি এক হাজার রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে তাঁকে মুক্ত করতে চাইলে তিনি বলেন,
"আমাকে এত কম মূল্যে বিক্রি করো না।"
পরে আরেক ব্যক্তি এক গাদা খড়ের বিনিময়ে তাঁকে কিনতে চাইলে তিনি বলেন,

"এবার আমাকে বিক্রি করে দাও। আমার এই মাটির দেহের প্রকৃত মূল্য এর চেয়ে বেশি নয়।"
এ কথা শুনে মঙ্গোল সৈন্য ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁকে শহীদ করে।
মাজার শরীফ
হযরত ফারীদুদ্দীন আত্তার নিশাপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহির মাজার শরীফ ইরানের নিশাপুরে অবস্থিত। বর্তমান মাজারের স্থাপনা পরবর্তীকালে আলী শীর নওয়াই নির্মাণ করেন।
সাতটি আধ্যাত্মিক উপত্যকা
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মানতিকুত তায়র-এ একজন সালিকের আধ্যাত্মিক অগ্রযাত্রার সাতটি স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো তাসাউফের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং আলাদা আলোচনার দাবি রাখে।

Comments

https://sufi.news/assets/images/user-avatar-s.jpg

0 comment

Write the first comment for this!