সোহরাওয়ার্দী তরিকার মূলনীতি: নফস দমন ও আত্মশুদ্ধির কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা
সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকায় 'চিল্লা' হলো পীরের তত্ত্বাবধানে ৪০ দিনব্যাপী এক কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা। বাহ্যিক জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিভৃত কক্ষে অবস্থান, নীরবতা পালন, স্বল্প আহার-নিদ্রা এবং সার্বক্ষণিক জিকির ও মোরাকাবার মাধ্যমে নফস বা কুপ্রবৃত্তি দমন করা হয়। এই কৃচ্ছ্রসাধনার মূল উদ্দেশ্য হলো— জাগতিক লোভ-লালসা ও অহংকার দূর করে অন্তরকে আল্লাহর প্রেমে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ করা।

1. সোহরাওয়ার্দী তরিকার মূলনীতি

সোহরাওয়ার্দী তরিকার মূলনীতি Sufibadi.com

সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকা হলো সুফি আবুল নাজিব সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র শেখ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.) কর্তৃক নিয়মতান্ত্রিকভাবে রূপায়িত একটি অন্যতম প্রধান সুফি সিলসিলা। এই তরিকার মূল ভিত্তি এবং নিয়মাবলি মূলত শেখ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আওয়ারিফুল মাআরিফ’ (Awarif-ul-Ma'arif)-এ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

অন্যান্য কিছু তরিকার মতো কেবল আবেগ বা আধ্যাত্মিক উন্মাদনা নয়, বরং শরিয়ত ও তরিকার মধ্যে কঠোর ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণই এই তরিকার মূল দর্শন।

সোহরাওয়ার্দী তরিকার মূলনীতি ও সাধনার নিয়মাবলি নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

 

সোহরাওয়ার্দী তরিকার প্রধান মূলনীতিসমূহ (Core Principles)

 

সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকায় আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য কয়েকটি স্তম্ভকে মূলনীতি হিসেবে গণ্য করা হয়:

1. শরিয়ত ও সুন্নাহর কঠোর অনুবর্তন: তরিকার মূল কথা হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও শরিয়তের বিধান পুরোপুরি মেনে চলা। বিদআত বা শরিয়ত বিরোধী সমস্ত কাজ সম্পূর্ণ বর্জন করা এই তরিকার প্রধান শর্ত।

2. জওক ও ওয়াজদ (আধ্যাত্মিক প্রেম ও উচ্ছ্বাস): আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম (জওক) ও ঐশ্বরিক ভাবে নিমগ্ন হওয়া (ওয়াজদ)-কে এই তরিকার আত্মিক শক্তি মনে করা হয়।

3. মানবসেবা ও সমাজ সংস্কার: সোহরাওয়ার্দী তরিকার সাধকেরা সংসার ত্যাগী হওয়ার চেয়ে সমাজে বাস করে গরিব-দুঃখীদের সেবা করা ও বিনয়ী থাকাকে আত্মশুদ্ধির অংশ মনে করেন।

4. পীরের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও আদব: আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক বা মুর্শিদের নির্দেশনার ওপর অবিচল থাকা এবং তাঁর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা।

 

 

 

সাধনার নিয়ম ও পদ্ধতি (Rules and Practices)

 

সোহরাওয়ার্দী তরিকায় একজন মুরিদ বা সাধকের জন্য নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক:

• পবিত্র জিকির (Zikr): এই তরিকায় আল্লাহর নামের জিকির অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। জিকিরের বিশেষ নিয়ম হলো— ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকিরের সময় ক্বলব বা হৃদযন্ত্র, কাঁধ এবং মাথার সমন্বয়ে নির্দিষ্ট শারীরিক ও মানসিক একাগ্রতার সাথে ধ্যানে মগ্ন হতে হয়। তারা আল্লাহর সাতটি বিশেষ নাম (আসমাউল হুসনা) আধ্যাত্মিক স্তর অনুযায়ী হাজার বার পুনরাবৃত্তি করার চর্চা করেন।

• চল্লিশ দিনের চিল্লা বা নির্জনবাস (Khilvat/Arba’iniya): আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং নফসের (কুপ্রবৃত্তি) কুপ্রভাব দূর করার জন্য এই তরিকায় নির্দিষ্ট সময় পরপর ৪০ দিনের জন্য নির্জন কক্ষে ইবাদতে বসা (চিল্লা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। এই সময়ে সাধক রোজা, মৌনতা এবং সার্বক্ষণিক জিকিরে লিপ্ত থাকেন।

• নফসের হিসাব গ্রহণ ও মোরাকাবা: প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া (মুহাসাবা) এবং আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকা (মোরাকাবা)। সব সময় মনের মধ্যে আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করা।

• সামা (Sama) শোনার নিয়ম: সোহরাওয়ার্দী তরিকায় কাওয়ালি বা আধ্যাত্মিক • সংগীত (সামা)-এর প্রচলন আছে। তবে এর জন্য অত্যন্ত কঠোর নিয়ম ও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সাধারণ বিনোদনের জন্য সামা শোনা নিষিদ্ধ; কেবল আল্লাহর স্মরণে হৃদয়ে গভীর প্রেম জাগ্রত করার উদ্দেশ্যেই বিশেষ আধ্যাত্মিক পরিবেশে এটি বৈধ।

• খিরকা (Khirqa) পরিধান: পীরের কাছ থেকে মুরিদের আধ্যাত্মিক যোগ্যতার প্রতীক বা বরকত হিসেবে বিশেষ পোশাক বা 'খিরকা' গ্রহণের নিয়ম এ তরিকায় বিশেষভাবে প্রচলিত।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, সোহরাওয়ার্দী তরিকার নিয়মাবলি মূলত একজন মানুষকে বাহ্যিকভাবে ইসলামের শরিয়তের অনুগামী করে এবং অভ্যন্তরীণভাবে কঠোর শৃঙ্খলা ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে সাহায্য করে।

 

সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকায় জিকির হলো ক্বলব (আত্মা) জাগ্রত করা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রধান মাধ্যম। এই তরিকায় জিকিরের পদ্ধতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং এতে বাহ্যিক অঙ্গভঙ্গি ও অভ্যন্তরীণ মনোযোগের এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে।

শেখ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এই তরিকার জিকিরের মূল নিয়মাবলি নিচে দেওয়া হলো:

 

১. জিকিরের বসার ভঙ্গি ও প্রস্তুতি (Posture and Preparation)

 

• পবিত্রতা অর্জন: জিকিরে বসার আগে ওজু করে শরীর, কাপড় এবং স্থান পবিত্র করে নিতে হয়। সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম।

• বসার নিয়ম: সাধারণত দু'হাঁটু গেঁড়ে (নামাজের তাশাহহুদের মতো) কিবলামুখী হয়ে বসতে হয়। চোখ বন্ধ করে সব ধরনের পার্থিব চিন্তা মন থেকে দূর করার চেষ্টা করতে হয়।

• মুর্শিদের কল্পনা (তাওাজ্জুহ): জিকির শুরুর আগে নিজের পীর বা মুর্শিদের প্রতি মনঃসংযোগ করা হয়, যাতে তাঁর আধ্যাত্মিক ফয়েজ বা বরকত জিকিরে সহায়তা করে।

 

২. জিকিরে ক্বলব ও শরীরের গতি (Physical and Spiritual Alignment)

 

সোহরাওয়ার্দী তরিকায় "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" জিকিরের সময় শরীরের একটি নির্দিষ্ট ছন্দময় আন্দোলন বা ঝাঁকুনি ব্যবহার করা হয়, যা ক্বলবে আঘাত করে ভেতরের কলুষতা দূর করে:

• 'লা' (না): জিকির শুরু করে 'লা' বলার সময় মাথা ও বুক ডান দিকে হেলে যায়। এর অর্থ হলো— আল্লাহ ছাড়া জগতের আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব বা মাবুদ নেই।

• 'ইলাহা' (কোনো উপাস্য): এরপর মাথা ও বুক বাম কাঁধের দিকে ঘোরে।

• 'ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া): সবশেষে মাথা ও বুক দিয়ে বাম স্তনের নিচে অবস্থিত ক্বলব বা হৃদপিণ্ডে সজোরে আঘাত (জরব) করা হয়। এর অর্থ— একমাত্র আল্লাহই সত্য এবং তিনিই হৃদয়ের মালিক।

 

৩. আসমায়ে সাব'আ বা সাতটি নামের জিকির

 

সোহরাওয়ার্দী তরিকায় সাধকের আধ্যাত্মিক উন্নতির ৭টি স্তর বা নফসের (কুপ্রবৃত্তির) স্তর রয়েছে। প্রতিটি স্তরের জন্য পীর মুরিদকে আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট নাম জিকির করার নির্দেশ দেন। এই নামগুলোকে "আসমায়ে সাব'আ" বলা হয়:

1. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (নফসে আম্মারা বা মন্দ আত্মার সংশোধনের জন্য)

2. আল্লাহ (নফসে লাওওয়ামা বা অনুতপ্ত আত্মার জন্য)

3. হু (নফসে মুলহিমা বা অনুপ্রেরণাপ্রাপ্ত আত্মার জন্য)

4. হাক্ক (নফসে মুতমাইন্নাহ বা প্রশান্ত আত্মার জন্য)

5. হায়্যূ (নফসে রাজিয়াহ বা সন্তুষ্ট আত্মার জন্য)

6. কাইয়ূম (নফসে মারদিয়াহ বা আল্লাহর সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত আত্মার জন্য)

7. কাহহার (নফসে কামিলা বা পূর্ণাঙ্গ আত্মার জন্য)

 

৪. জিকিরের প্রকারভেদ (Types of Zikr)

 

• জিকিরে জলি (উচ্চস্বরে জিকির): সাধনার প্রাথমিক স্তরে মুরিদদের একাগ্রতা বাড়াতে এবং মনের অলসতা দূর করতে পীরের উপস্থিতিতে দলগতভাবে বা একা উচ্চস্বরে জিকির করা হয়।

• জিকিরে খফি (গোপন বা মৌন জিকির): সাধনার উচ্চ স্তরে জিহ্বা না নাড়িয়ে সম্পূর্ণ নীরবে, কেবল হৃদয়ের স্পন্দনের সাথে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয়। এটি অত্যন্ত • শক্তিশালী ও গভীর ধ্যানের অংশ।

 

৫. সংখ্যার নিয়ম ও মোরাকাবা

 

পীরের নির্দেশানুযায়ী প্রতিদিন ফজরের পর এবং মাগরিব বা এশার পর একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় (যেমন: ১০০, ১০০০ বা তার বেশি) জিকির সম্পন্ন করতে হয়। জিকির শেষে কিছুক্ষণ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে মোরাকাবা (ধ্যান) করতে হয়, যেন জিকিরের নূর বা আলো পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

সোহরাওয়ার্দী তরিকায় অনুমতি বা 'ইজাজত' ছাড়া উচ্চ স্তরের জিকির করা নিষিদ্ধ, কারণ পীরের তত্ত্বাবধান ছাড়া সঠিক আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব নয় বলে মনে করা হয়।

 

সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকায় মোরাকাবা (আধ্যাত্মিক ধ্যান) হলো জিকিরের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। 'মোরাকাবা' শব্দের অর্থ হলো পর্যবেক্ষণ করা বা পাহারা দেওয়া। সুফি পরিভাষায়, নিজের অন্তরের প্রতি লক্ষ্য রাখা যে আল্লাহ আমাকে দেখছেন এবং আমার অন্তরের অবস্থা জানছেন।

এই তরিকায় মোরাকাবা করার সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও ধাপসমূহ নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

 

১. মোরাকাবার প্রস্তুতি ও পরিবেশ (Preparation)

 

• সময়: মোরাকাবার জন্য সর্বোত্তম সময় হলো গভীর রাত (তাহাজ্জুদের সময়), অথবা জিকির শেষ করার অবিলম্বের পরের সময়টুকু (যেমন ফজর ও মাগরিবের পর)।

• স্থান: আলোহীন বা মৃদু আলোর একটি নিস্তব্ধ কক্ষ বেছে নিতে হয়, যেখানে কোনো ধরনের কোলাহল বা বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা থাকে না।

• শারীরিক অবস্থা: ওজু করে পবিত্র হয়ে সুগন্ধি মেখে বসতে হয়। ঢিলেঢালা পোশাক পরা উত্তম যাতে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট না হয়।

 

২. বসার আসন ও শারীরিক ভঙ্গি (Posture)

 

• আসন: সাধারণত নামাজের তাশাহহুদের মতো দু'হাঁটু গেঁড়ে বসতে হয়। তবে দীর্ঘক্ষণ বসার সুবিধার্থে কেউ • চাইলে বাবু হয়ে (পদ্মাসন বা সুখাসনে) বসতে পারেন।

• ভঙ্গি: মেরুদণ্ড ও ঘাড় একদম সোজা রাখতে হবে। দুই হাত দুই হাঁটুর ওপর স্বাভাবিকভাবে রাখা হয়।

• দৃষ্টি: চোখ দুটি আলতো করে বন্ধ করে নিতে হয়, যেন বাহ্যিক জগতের কোনো দৃশ্য মনে না পড়ে। মাথা সামান্য নিচের দিকে (ক্বলব বা হৃদযন্ত্রের দিকে) ঝুঁকিয়ে রাখতে হয়।

 

৩. আধ্যাত্মিক সংযোগ ও কল্পনা (Spiritual Core Practices)

 

সোহরাওয়ার্দী তরিকার মোরাকাবায় মূল কাজ চলে মনের ভেতরে। এর প্রধান তিনটি ধাপ হলো:

• তাসাউওরে মুর্শিদ (পীরের ধ্যান): শুরুতে সাধক কল্পনা করেন যে তাঁর মুর্শিদ (পীর) তাঁর সামনে উপস্থিত আছেন এবং মুর্শিদের ক্বলব থেকে ঐশ্বরিক আলো বা ফয়েজ নির্গত হয়ে সাধকের ক্বলবে প্রবেশ করছে। সুফি তত্ত্বে মুর্শিদ হলেন আল্লাহর রহমত প্রাপ্তির মাধ্যম।

• তাসাউওরে মউত (মৃত্যুর ধ্যান): নিজেকে মৃত ভাবা, কাফনের কাপড় পরানো, কবরে রাখা এবং আল্লাহর সামনে হিসাব দেওয়ার দৃশ্য মনে মনে কল্পনা করা। এটি মন থেকে দুনিয়ার সমস্ত লোভ-লালসা দূর করতে সাহায্য • করে।

• হুজুরি কালব (আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করা): পবিত্র কুরআনের আয়াত— "তিনি তোমাদের সাথেই আছেন, তোমরা যেখানেই থাকো না কেন" (সূরা হাদিস: ৪)— এই ভাবনায় ডুবে যাওয়া। সাধক মনে মনে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেন যে:

১. আল্লাহ আমাকে দেখছেন।

২. আল্লাহ আমার কথা শুনছেন।

৩. আল্লাহ আমার মনের অবস্থা জানছেন।

 

৪. শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ ও জিকির (Breathing and Zikr)

 

মোরাকাবার গভীর স্তরে সাধক শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি ধীর ও সুশৃঙ্খল করেন।

• শ্বাস ভেতরে নেওয়ার সময় মনে মনে "আল্লাহ" এবং শ্বাস ত্যাগ করার সময় মনে মনে "হু" উচ্চারণ করা হয়।

• জিহ্বা বা ঠোঁট মোটেই নড়বে না; সমস্ত মনোযোগ থাকবে কেবল বাম স্তনের নিচে অবস্থিত মাংসপিণ্ড বা ক্বলবের দিকে। সাধক কল্পনা করেন যে তাঁর ক্বলব বা হৃদপিণ্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে 'আল্লাহ আল্লাহ' • ধ্বনি করছে।

 

৫. মোরাকাবা সমাপ্তির নিয়ম

 

পীরের নির্দেশ অনুযায়ী সাধারণত ২০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় মোরাকাবা করা হয়। মোরাকাবা শেষ করার সময় তাড়াহুড়ো করে চোখ খোলা যাবে না। অত্যন্ত ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে হয় এবং হাত তুলে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে মোনাজাত করতে হয়।

 

সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকায় চিল্লা বা নির্জনবাস (Khilvat) হলো নফস বা কুপ্রবৃত্তিকে পুরোপুরি দমন করে আত্মশুদ্ধির চরম শিখরে পৌঁছানোর একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক কোর্স। ফার্সি 'চেহেল' (চল্লিশ) শব্দ থেকে চিল্লা শব্দের উৎপত্তি। শেখ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ.) তাঁর 'আওয়ারিফুল মাআরিফ' গ্রন্থে এই নির্জনবাসের গুরুত্ব ও এর কঠোর নিয়মাবলি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

পীরের অনুমতি ও সরাসরি তত্ত্বাবধান ছাড়া চিল্লায় বসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর প্রধান এবং কঠোর নিয়মকানুনগুলো নিচে দেওয়া হলো:

 

১. স্থান ও পরিবেশের কঠোরতা

 

• সম্পূর্ণ নির্জন কক্ষ: চিল্লার জন্য এমন একটি ছোট ও অন্ধকার বা মৃদু আলোর ঘর (হুজরা) নির্বাচন করা হয় যেখানে বাইরের কোনো আলো-বাতাস বা শব্দ সহজে প্রবেশ করে না।

• বাহ্যিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতা: ৪০ দিন সাধক সেই কক্ষের বাইরে যেতে পারবেন না। কেবল জামাতে নামাজ পড়ার জন্য (যদি চিল্লা কক্ষটি মসজিদের সাথে যুক্ত থাকে) অথবা অতি জরুরি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বের হওয়ার • অনুমতি থাকে।

 

২. আহার ও পানীয়ের কঠোর নিয়ম (Dietary Restrictions)

 

• স্বল্প আহার (ক্ষুধা মরণ): চিল্লায় পেট পুরে খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সাধক চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র একবার বা দুবার অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে খাবার গ্রহণ করেন, যা কেবল বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন।

• নির্দিষ্ট খাবার: সাধারণত তেল-চর্বিহীন, মসলাহীন এবং হালকা নিরামিষ খাবার (যেমন রুটি, পানি বা সামান্য ডাল) দেওয়া হয়। কোনো ধরনের সুস্বাদু বা বিলাসী খাবার খাওয়া যায় না।

• পবিত্রতা: খাবার যিনি তৈরি করবেন এবং যিনি ঘরের দরজায় দিয়ে যাবেন, তাঁদেরও চরম পারহেজগার (পরহেজগার) ও ওজু অবস্থায় থাকতে হয়।

 

৩. বাকসংযম ও মৌনতা (Silence)

 

• সম্পূর্ণ নীরবতা: চিল্লা চলাকালীন সাধক কারও সাথে কোনো কথা বলতে পারবেন না। যদি ঘরের দরজায় খাবার দিতে আসা খাদেমের সাথে কোনো জরুরি ইশারা বা যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, • তবেই কেবল ন্যূনতম ইঙ্গিত করা যায়, তাও মুখে শব্দ না করে।

 

৪. নিদ্রা ও আরাম বর্জন

 

• স্বল্প নিদ্রা: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাধক মাত্র কয়েক ঘণ্টা (সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা) ঘুমানোর অনুমতি পান। আরামদায়ক বিছানা ব্যবহার নিষিদ্ধ; সাধারণত চট, মাদুর বা সামান্য কম্বলের ওপর ঘুমাতে হয়।

• সার্বক্ষণিক ইবাদত: ঘুমের সময় ছাড়া বাকি পুরোটা সময় নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং মোরাকাবায় নিমগ্ন থাকতে হয়। রাতে ঘুমানোর চেয়ে জেগে তাহাজ্জুদ ও মোনাজাতে সময় কাটানো বাধ্যতামূলক।

 

৫. সার্বক্ষণিক পবিত্রতা ও নফসের পাহারা

 

• সব সময় ওজু রাখা: চিল্লার ঘরে সাধককে ২৪ ঘণ্টা ওজু অবস্থায় থাকতে হয়। ওজু ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে আবার ওজু করে নিতে হয়।

• ওয়াসওয়াসা (কুচিন্তা) দমন: নির্জনে থাকলে শয়তান ও নফসের পক্ষ থেকে নানা রকম ভয়, কুচিন্তা বা অলীক বিভ্রম (হ্যালুসিনেশন) তৈরি হতে পারে। এই কঠোর চিল্লায় নিয়ম হলো— মনের ভেতর যেকোনো চিন্তা আসবামাত্রই "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বা আল্লাহর বিশেষ নামের জরব • (আঘাত) দিয়ে তা মন থেকে তাড়িয়ে দিতে হয়।

 

চিল্লার মূল উদ্দেশ্য:

 

এই ৪০ দিনের কঠোর সাধনার মূল লক্ষ্য হলো— মানুষের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার, লোকদেখানো ইবাদতের ইচ্ছা (রিয়া) এবং দুনিয়ার মোহকে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া। ৪০ দিন পর সাধক যখন চিল্লা থেকে বের হন, তখন তাঁর অন্তর আল্লাহর প্রেমে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হয়ে যায় বলে সুফিগণ বিশ্বাস করেন।

Sufi.News Portal (Sufibadi.com) is a digital sanctuary spreading Sufi wisdom, human love, and interfaith harmony. We highlight saint biographies, sacred traditions, and spiritual practices to foster inner peace and global unity. ​Join our community grounded in compassion and unconditional love! ​📞 Contact: +880-1840624624 (BD) / +91-9332594925 (IN) | Email: moinur.chisty@sufibadi.com | Web: Sufibadi.com Email: sufibadillc@gmail.com

Comments

https://sufi.news/assets/images/user-avatar-s.jpg

0 comment

Write the first comment for this!