হাজী ওয়ারিস আলী শাহ এবং দেওয়াসরিফ: সুফি দর্শন ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অনন্য উপাখ্যান
8
views
"জো ইশক হো উয়হি দ্বীন হ্যায়" (প্রেমই প্রকৃত ধর্ম)—এই সর্বজনীন বাণীর ধারক ও 'ওয়ারসি' সুফি তরিকার প্রবর্তক ছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওয়া শরীফের মহান সাধক হাজী ওয়ারিস আলী শাহ (১৮১৭-১৯০৫)। জাত-পাত ও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে নিঃশর্ত ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। আজও তাঁর স্মৃতিবিজড়িত দেওয়া শরীফের ওরস ও বাৎসরিক মেলা উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য ঐতিহাসিক প্রতীক।

1. হাজী ওয়ারিস আলী শাহ (রহঃ)

হাজী ওয়ারিস আলী শাহ (রহঃ) sufibadi.com

হাজী ওয়ারিস আলী শাহ (১৮১৭–১৯০৫) ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাবাঁকি জেলার দেওয়াওয়া (বা দেওয়াসরিফ) শহরের একজন বিখ্যাত সুফি সাধক এবং 'ওয়ার্সি' সুফি ধারার প্রবর্তক। তাঁর বিস্তারিত জীবনী নিচে তুলে ধরা হলো:

 

জন্ম ও বংশপরিচয়

 

• জন্ম: তিনি ১৮১৭ বা ১৮১৯ সালের দিকে ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাবাঁকি জেলার দেওয়াওয়া শরীফে জন্মগ্রহণ করেন।

• বংশ: তিনি হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ২৬তম বংশধর এবং তাঁর পূর্বপুরুষরা ইরানের নিশাপুর থেকে ভারতে এসে বসবাস শুরু করেছিলেন।

• পিতা-মাতা: তাঁর পিতা ছিলেন সৈয়দ কুরবান আলী শাহ এবং মাতা সৈয়দা বিবি সাকিনা। মাত্র তিন বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবা-মাকে হারান। এরপর তাঁর ভগ্নিপতি ও মুরশিদ হাজি সৈয়দ খাদিম আলী শাহ তাঁকে লালন-পালন ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেন।

 

শিক্ষা ও বাল্যকাল

 

• তিনি অত্যন্ত অল্প বয়সে অলৌকিক মেধার পরিচয় দেন এবং শৈশবেই পবিত্র কোরআন হিফজ করেন।

• আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই তীব্র ছিল। তিনি খাদিম আলী শাহের কাছ থেকে কাদেরিয়া ও চিশতিয়া তরিকাসহ সুফিবাদের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন।

 

ভ্রমণ ও জীবনদর্শন

 

• বিস্তৃত ভ্রমণ: তিনি আরব, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, রাশিয়া, জার্মানি ও ইংল্যান্ডসহ ইউরোপ ও পশ্চিমের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। একাধিকবার পায়ে হেঁটে হজ পালন করেন।

• প্রভাবশালী সাক্ষাৎ: তাঁর ভ্রমণের সময় তিনি তৎকালীন বিশ্বের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যেমন—অটোমান সুলতান আবদুল মজিদ, প্রিন্স বিসমার্ক এবং রানি ভিক্টোরিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

• প্রেম ও সম্প্রীতি: তাঁর প্রধান বাণী ছিল "জো ইশক হো উয়হি দ্বীন হ্যায়" (যিনি প্রেমের অধিকারী, তিনিই প্রকৃত ধর্মের অনুসারী)। তিনি কোনো নির্দিষ্ট গোঁড়ামিতে বিশ্বাসী ছিলেন না এবং সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ঐক্যের বার্তা প্রচার করতেন। তাঁর ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে মুসলিম ছাড়াও হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

 

 

আধ্যাত্মিক সফর ও হজ্জ পালন

 

তিনি জীবনের একটি দীর্ঘ সময় ভ্রমণ ও আধ্যাত্মিক সাধনায় কাটান:

• দীর্ঘ ভ্রমণ: তিনি প্রায় ১২ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেন। এই সফরে তিনি আরব, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মেসোপটেমিয়া (ইরাক), ইরান, তুরস্ক, রাশিয়া ও জার্মানি সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন।

• হজ্জ: তিনি তাঁর জীবনে ১০ বার পবিত্র হজ্জ পালন করেন। তাঁর বেশিরভাগ সফরই ছিল পায়ে হেঁটে এবং হজ্জের সময় তিনি ইহরাম বা তীর্থযাত্রীর সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন।

• ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ: ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণের সময় তৎকালীন তুরস্কের অটোমান সুলতান, জার্মানির চ্যান্সেলর বিসমার্ক এবং রানি ভিক্টোরিয়ার মতো ব্যক্তিত্বদের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

দর্শন ও আধ্যাত্মিক তরিকা (সিলসিলা): 

 

• ওয়ারসি তরিকা: তিনি "ওয়ারসি" সুফি তরিকার প্রবর্তন করেন। তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে হিন্দু, মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষ তাঁর আধ্যাত্মিক আদর্শে দীক্ষিত হন।

 

সর্বজনীন ভালোবাসা (ইশ্ক): তাঁর মূল শিক্ষা ছিল ঈশ্বরের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং মানবতার সেবা। তিনি মনে করতেন, স্রষ্টাকে পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো নিঃশর্ত ভালোবাসা। তিনি জাত-পাত ও ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা দেন।

 

 

ওফাত ও মাজার শরীফ

 

• ওফাত: ১৯০৫ সালের ৭ এপ্রিল (১৩২৩ হিজরি) এই মহান সুফি সাধক মৃত্যুবরণ করেন।

• মাজার (দেওয়া শরীফ): ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাবাঁকিতে তাঁর পবিত্র মাজার অবস্থিত, যা দেওয়া শরীফ নামে খ্যাত। তাঁর অনুসারীদের দ্বারা নির্মিত এই মাজারে প্রতি বছর বার্ষিক ওরস ও ঐতিহ্যবাহী "দেওয়া মেলা" অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সর্বধর্মের হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন।

 

বারাবাঁকি জেলার দেওয়া শরীফের ওরস ও বার্ষিক মেলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, আধ্যাত্মিকতা এবং অনন্য সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক ঐতিহাসিক প্রতীক। সুফি সাধক হাজি ওয়ারিস আলী শাহের স্মৃতিবিজড়িত এই উৎসবের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:

 

১. মেলার উৎপত্তি ও সূচনা

 

দেওয়া শরীফে মূলত দুটি বড় উৎসব হয়—হাজি ওয়ারিস আলী শাহের নিজস্ব ওরস শরীফ (যা হিজরি সফর মাসে অনুষ্ঠিত হয়) এবং তাঁর পিতা সৈয়দ কুরবান আলী শাহের স্মৃতিতে আয়োজিত দেওয়া মেলা ও ওরস (যা কার্তিক মাসে অনুষ্ঠিত হয়)।

এই মেলার সূচনা করেছিলেন স্বয়ং হাজি ওয়ারিস আলী শাহ। তাঁর পিতা সৈয়দ কুরবান আলী শাহের মৃত্যুর পর ভক্তরা যখন তাঁর স্মরণে একটি বাৎসরিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে চান, তখন হাজি সাহেব একটি শর্তে রাজি হন। শর্তটি ছিল—সেখানে কেবল ধর্মীয় আচারই হবে না, বরং সাধারণ মানুষের জন্য একটি মেলা বা প্রদর্শনীও থাকতে হবে, যেখানে সব ধর্মের মানুষ অংশ নিতে পারবে। সেই থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই প্রথা চলে আসছে।

 

 

হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে ওরস (অনন্য বৈশিষ্ট্য)

 

ইসলামী সুফি ধারার উৎসবগুলো সাধারণত হিজরি বা চান্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। কিন্তু দেওয়া শরীফের এই মেলার অন্যতম ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হলো, এটি হিন্দু চন্দ্র পঞ্জিকা (কার্তিক মাস, সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর) মেনে আয়োজন করা হয়।

হাজি ওয়ারিস আলী শাহের সূচিত ঐতিহ্য অনুযায়ী, তাঁর পিতার এই ওরসটি প্রতি বছর হিন্দুদের পবিত্র 'করওয়া চৌথ' উৎসবের দিনে বা তার আশেপাশে পড়ে। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের গঙ্গা-যমুনা সংস্কৃতির (উদার ও মিশ্র ঐতিহ্য) এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এক অনন্য নিদর্শন।

 

৩. মেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড

 

১০ দিনব্যাপী চলা এই দেওয়া মেলায় আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি বিশাল এক সাংস্কৃতিক উৎসবের রূপ নেয়:

• পশু মেলা (Cattle Market): শুরুর দিকে এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল গবাদি পশুর বিশাল বাজার, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখত।

 

• সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: মেলা প্রাঙ্গণে ঐতিহ্যবাহী অল-ইন্ডিয়া মুশায়েরা (কবি সম্মেলন), কবি সম্মেলন, সংগীতানুষ্ঠান, কাওয়ালি এবং আধ্যাত্মিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়।

• হস্তশিল্প প্রদর্শনী: বিভিন্ন রাজ্য থেকে কারিগররা এসে তাঁদের তৈরি হস্তশিল্পের পসরা সাজিয়ে বসেন।

• আতশবাজি: মেলার সমাপনী দিনে এক বর্ণিল আতশবাজি প্রদর্শনীর মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

 

৪. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক

 

হাজি ওয়ারিস আলী শাহের মূল বাণীই ছিল—"জো রব হ্যায়, ওহি রহমান হ্যায়" (যিনি ঈশ্বর, তিনিই পরম করুণাময়)। এই মেলায় জাতি, ধর্ম বা বর্ণের কোনো বৈষম্য থাকে না। হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে মাজারে চাদর চড়ান এবং মেলায় অংশ নেন। এমনকি দেওয়া শরীফ এমন একটি অনন্য স্থান, যেখানে হোলি উৎসবের সময় হিন্দু-মুসলিমরা মিলেমিশে দরগাহ প্রাঙ্গণে আবির খেলেন।

 

 

বর্তমানে Government of Uttar Pradesh এবং স্থানীয় প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই জেলা মেলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রতি বছর (যেমন ২০২৩ ও ২০২৪ সালের পর ২০২৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বরেও) মহাসমারোহে আয়োজিত হয়ে আসছে।

Sufi.News Portal (Sufibadi.com) is a digital sanctuary spreading Sufi wisdom, human love, and interfaith harmony. We highlight saint biographies, sacred traditions, and spiritual practices to foster inner peace and global unity. ​Join our community grounded in compassion and unconditional love! ​📞 Contact: +880-1840624624 (BD) / +91-9332594925 (IN) | Email: moinur.chisty@sufibadi.com | Web: Sufibadi.com

Comments

https://sufi.news/assets/images/user-avatar-s.jpg

0 comment

Write the first comment for this!

Facebook Conversations