1. ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী (রহ.)
sufibadi.com
ছবিতে যাঁকে দেখতে পাচ্ছেন, তিনি হলেন উসমানীয় যুগের বিশিষ্ট নক্বশেবন্দী মুজাদ্দেদী সুফি সাধক ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী কুদ্দিসা সিররুহুল আজিজ। তিনি ছিলেন ইমামে রব্বানী মোজাদ্দিদে আলফেসানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার বহনকারী নক্বশেবন্দী মোজাদ্দেদী তরিকার একজন বিশিষ্ট সাধক। তাঁর আধ্যাত্মিক সিলসিলা নিম্নরূপ:
১. ইমাম আহমদ সিরহিন্দি, মোজাদ্দিদে আলফেসানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ২. ইমাম খালিদ আল-বাগদাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ৩. ইমাম ত্বহা আল-হাক্কারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ৪. ইমাম মুহাম্মাদ আফেন্দী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ৫. ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
উসমানীয় খেলাফত ও ইমাম ইরবিলীর ইসলামবুল আগমন
উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ খান কুদ্দিসা সিররুহু ছিলেন নক্বশেবন্দী মোজাদ্দেদী তরিকার প্রতি গভীর অনুরাগী। তাঁর শাসনামলে ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে ইরবিল থেকে ইসলামবুলে আমন্ত্রণ জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে উস্কুদারে প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁর খানকাহ শরিফ, যা ‘কালামী টেক্কা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই খানকাহ একসময় নকশবন্দি মুজাদ্দিদি আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা ও তাসাউফচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
কামালপন্থী শাসন, খানকাহ বন্ধ এবং ইমাম ইরবিলীর শাহাদাত
উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর তুরস্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত নতুন প্রজাতন্ত্রের শাসনামলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সুফি খানকাহগুলোর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ১৯২৫ সালে গৃহীত আইনের মাধ্যমে তুরস্কের খানকাহ, টেক্কা ও দরগাহগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এরপর ১৯৩০ সালে মেনেমেন বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকার ধর্মীয় নেতৃত্ব ও সুফি মহলের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। বহু আলেম, সুফি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন। ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী কুদ্দিসা সিররুহুও গ্রেফতার হন। ১৯৩১ সালে কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে বিষপ্রয়োগের অভিযোগও প্রচলিত রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা কোনো আধ্যাত্মিক ধারার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে পারেনি। বরং এই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েই নকশবন্দি মুজাদ্দিদি সিলসিলার শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে থাকে।
ইমাম ইরবিলী থেকে ইসকিনদার পাশা: আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা
ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী রহমাতুল্লাহি আলাইহির মুরিদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইমাম আবদুল আজিজ বাক্কিনে রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর আধ্যাত্মিক ধারার পরবর্তী বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম যাহিদ কোকতু রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
ইমাম যাহিদ কোকতু রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইস্তাম্বুলের ইসকিনদার পাশা মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলকে কেন্দ্র করে একটি গুরুত্বপূর্ণ নকশবন্দি খালিদি-মুজাদ্দিদি জামাত গড়ে তোলেন। তাঁর সান্নিধ্যে একদল তরুণ ধর্মীয় শিক্ষা, আত্মশুদ্ধি, সামাজিক দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হন। তাঁদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে তুরস্কের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী কয়েকজন ব্যক্তিত্ব বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেন।
তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অধ্যাপক নাজমুদ্দীন এরবাকান রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রপতি তুরগুত ওজাল রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
তুরস্কের রাজনীতিতে আধ্যাত্মিক প্রভাব
আধুনিক তুরস্কের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে নাজমুদ্দীন এরবাকান এবং তুরগুত ওজালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কাজ করলেও তুরস্কের মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবনের আলোচনায় তাঁদের নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়।
অনেকের মতে, তুরগুত ওজালের সময় যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের নেতৃত্বে তার কিছু ফলাফল আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে সরাসরি কোনো একক সুফি জামাতের সাংগঠনিক প্রকল্প হিসেবে দেখার চেয়ে তুরস্কের দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসংগত।
রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের সঙ্গে ইসকিনদার পাশা জামাতের আধ্যাত্মিক পরিবেশের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে তিনি সরাসরি ইমাম যাহিদ কোকতু রহমাতুল্লাহি আলাইহির মুরিদ ছিলেন, এমন দাবি নিশ্চিতভাবে করা যায় না। বরং তাঁর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক গঠনে ইমাম যাহিদ কোকতু রহমাতুল্লাহি আলাইহির খলিফা শাইখ মাহমুদ আসাদ জোশান কুদ্দিসা সিররুহুর প্রভাবের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
উপসংহার: ইতিহাসের প্রবাহে নক্বশেবন্দী মোজাদ্দেদী উত্তরাধিকার
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, উসমানীয় যুগে যে নক্বশেবন্দী মোজাদ্দেদী আধ্যাত্মিক ধারা ইসলামবুলের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও তার শিক্ষা ও প্রভাব বিভিন্ন প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।
ইরবিল থেকে ইসলামবুল, কালামী টেক্কা থেকে ইসকিনদার পাশা, ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী থেকে ইমাম আবদুল আজিজ বাক্কিনে, ইমাম যাহিদ কোকতু এবং শাইখ মাহমুদ আসাদ জোশান রহমাতুল্লাহি আলাইহিমের ধারাবাহিকতা তুরস্কের সুফি ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
আল্লাহ তাআলা ইমামে রব্বানী মোজাদ্দেদে আলফেসানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং তাঁর সিলসিলার সকল বুযুর্গের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁদের ইলম, ইখলাস, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা থেকে আমাদের উপকৃত হওয়ার তাওফিক দান করুন।
আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
ছবিটি ১৯৩১ সালে ইমাম আসাদ আল-ইরবিলী রহমাতুল্লাহি আলাইহির গ্রেফতারের সময়কার বলে পরিচিত।

Comments
0 comment