মালাংগড়ের মহান সুফি সাধক হাজি আবদুল রহমান মালাং বাবা
দ্বাদশ শতাব্দীর সুফি সাধক হযরত হাজি আবদুল রহমান মালাং বাবা (র.) মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের মহারাষ্ট্রের মালাংগড় পাহাড়ে এসে ইসলাম ও মানবতার বাণী প্রচার করেন। স্থানীয় কেতকার ব্রাহ্মণ পরিবারের সঙ্গে তাঁর তৃষ্ণা নিবারণের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর মাজারে যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলিম যৌথ ব্যবস্থাপনার এক অনন্য অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য বজায় রয়েছে। আধ্যাত্মিক প্রভাব, অলৌকিক কারামাত এবং বার্ষিক উরস উৎসবের মধ্য দিয়ে তাঁর দরগাহ আজ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে লাখো মানুষের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
Sufibadi.com

হযরত হাজি আবদুল রহমান মালাং বাবা (যিনি হাজি মালাং হুজুর নামে সর্বাধিক পরিচিত) ছিলেন দ্বাদশ শতকের একজন বিখ্যাত সুফি সাধক এবং ইসলাম প্রচারক। মধ্যপ্রাচ্য (বিশেষ করে ইয়েমেন বা সৌদি আরব) থেকে আগত এই মহান সাধক ভারতের মহারাষ্ট্রের কল্যাণ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। বর্তমানে মুম্বাইয়ের অদূরে কল্যাণের মালাংগড় পাহাড়ে তাঁর পবিত্র মাজার শরিফ অবস্থিত।

তাঁর জীবন ও অলৌকিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

 

১. ভারতে আগমন ও উদ্দেশ্য

 

ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দ্বাদশ শতাব্দীতে হাজি মালাং হুজুর তাঁর কিছু সঙ্গী ও অনুসারী নিয়ে ভারতের মহারাষ্ট্রের ‘ব্রাহ্মণওয়াদী’ গ্রামে আসেন, যা তখন মৌর্য রাজবংশের রাজা নলদেব দ্বারা শাসিত হচ্ছিল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, তৎকালীন সময়ে ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ বিভিন্ন অশুভ শক্তি, অত্যাচারী শাসক এবং অন্যায়ের কারণে চরম দুর্ভোগে ছিলেন। মানবজাতিকে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করতে এবং শান্তির বাণী ছড়াতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি এই অঞ্চলে আসেন।

 

২. তৃষ্ণার্ত বাবা ও ব্রাহ্মণ পরিবারের ঐতিহাসিক ঘটনা

 

গ্রামে পৌঁছানোর পর হাজি মালাং হুজুর এবং তাঁর সঙ্গীরা প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন। তাঁরা ‘কেতকার’ নামক এক স্থানীয় ব্রাহ্মণ পরিবারের দরজায় গিয়ে পানি প্রার্থনা করেন। সুফি সাধকদের ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত দেখে সেই ব্রাহ্মণ পরিবার অত্যন্ত সদয় হয়ে তাঁদের কেবল পানিই নয়, বরং দুধ পান করান এবং বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেন।

ব্রাহ্মণ পরিবারের এই মানবিক আচরণে খুশি হয়ে হাজি মালাং হুজুর তাদের মন উজাড় করে দোয়া ও আশীর্বাদ করেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্র ধরেই আজ পর্যন্ত তাঁর মাজারের একটি অনন্য ঐতিহ্য বজায় রয়েছে।

 

৩. আধ্যাত্মিক যুদ্ধ ও সমাজ সংস্কার

 

হাজি মালাং হুজুর তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়ে ওই অঞ্চলের অন্যায়, অত্যাচার এবং অশুভ শক্তির অবসান ঘটান। তিনি কল্যাণের পাহাড়ে আস্তানা গেড়ে মানুষের মধ্যে প্রেম, সাম্য ও সুফিবাদের বাণী প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা (কারামাত) এবং পবিত্র চরিত্র দেখে বহু মানুষ অনুপ্রাণিত হন এবং স্থানীয় রাজার কন্যাসহ অনেকেই ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেন।

 

৪. মাজার শরিফ ও প্রধান দর্শনীয় স্থান

 

পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হাজি মালাং দরগাহ বা মালাংগড় দুর্গ আজ এক অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। মূল মাজারে যাওয়ার পথে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে:

• প্রথম ও দ্বিতীয় সালামি: মূল দরগাহে পৌঁছানোর আগে ভক্তদের তাঁর দুই প্রধান শিষ্য—হযরত বখতওয়ার শাহ বাবা (প্রথম সালামি) এবং হযরত সুলতান শাহ বাবার (দ্বিতীয় সালামি) মাজারে • হাজিরা দিতে হয়।

• পাঁচ পীর (Panch Pir): পাহাড়ের অন্য পাশে তাঁর পাঁচজন একনিষ্ঠ অনুসারীর মাজার রয়েছে, যা ‘পাঁচ পীর’ নামে পরিচিত।

• ঘোড়ে কি টাপ (Ghode Ki Taap): পাহাড়ের একটি পাথুরে পানির উৎস, যা বিশ্বাস অনুযায়ী হুজুরের ঘোড়ার খুরের আঘাতে তৈরি হয়েছিল এবং এর পানি রোগ নিরাময়কারী হিসেবে পরিচিত।

 

৫. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক

 

হাজি মালাং হুজুরের দরগাহটি ভারতে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অন্যতম বড় নিদর্শন। শত শত বছর ধরে এই দরগাহের দেখভালের দায়িত্ব যৌথভাবে পালন করা হয়। প্রথা অনুযায়ী, এখানে একজন মুসলিম 'মুতাওয়াল্লি' (তত্ত্বাবধায়ক) এবং কেতকার ব্রাহ্মণ পরিবারের বংশোদ্ভূত একজন হিন্দু 'ওয়াহিভাটদার' বা পুরোহিত যৌথভাবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।

 

৬. বার্ষিক উরস উৎসব

 

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে (আরবি চান্দ্র মাস অনুযায়ী) মালাংগড়ে অত্যন্ত ধুমধামের সাথে তাঁর বার্ষিক উরস শরিফ উদযাপিত হয়। এই উৎসবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষ পাহাড়ে সমবেত হন। উরসের রাতে হুজুরের পবিত্র পালকি (Palkhi Procession) নিয়ে পুরো পাহাড়ে শোভাযাত্রা করা হয় এবং বর্ণিল আতশবাজি ফোটানো হয়।

sufi.news একটি ব্যতিক্রমী অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যা বিশ্বজুড়ে সুফি দর্শন, আধ্যাত্মিক চেতনা ও শাশ্বত শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। আজকের কোলাহলপূর্ণ বিশ্বে মানুষের মনের শান্তি ও আত্মার খোরাক জোগাতে এটি একটি আধ্যাত্মিক সেতু। আমরা ইতিহাসের মহান সুফি সাধকদের জীবনী, মরমী সাহিত্য, কাওয়ালি-মাইজভান্ডারী সংগীত এবং আত্মশুদ্ধির প্রামাণ্য গাইডলাইন প্রকাশ করি। কোনো চটকদার খবর নয়; বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সাথে আধ্যাত্মিক চেতনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি শান্তিময় ও মানবিক সমাজ গঠনে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।