views
Picture from Wikipedia
কুতুব-এ-জামান হযরত হাজী আলী শাহ বুখারী (রহ.): এক মহান সূফী সাধকের জীবন ও অলৌকিক উপাখ্যান
সূফীবাদের ইতিহাসে এমন কিছু মহামানব এসেছেন, যাঁদের ত্যাগ, খোদাভীতি ও আধ্যাত্মিক উচ্চতা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতিকে আলোড়িত করে। এমনই এক কালজয়ী সূফী ব্যক্তিত্ব হলেন কুতুব-এ-জামান হযরত পীর সৈয়দ হাজী আলী শাহ বুখারী (রহ.)। ভারতের মুম্বাইয়ের আরব সাগরের বুকে অবস্থিত তাঁর পবিত্র হাজী আলী দরগাহ আজও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কোটি কোটি মানুষের আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল।
ইতিহাস এবং বিশ্বস্ত সূফী বিবরণী থেকে সংগৃহীত তাঁর জীবনের বিশেষ ও অলৌকিক অধ্যায়গুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সূচনাকাল: বৈভব ত্যাগ ও সূফী দর্শনে দীক্ষা
চতুর্দশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে হযরত হাজী আলী বর্তমান উজবেকিস্তানের বিখ্যাত রেশম পথ (Silk Road) সংলগ্ন বোখারা (Bukhara) অঞ্চলে এক অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিখ্যাত সূফী সাধক মীর সাইয়্যিদ আলী হামাদানী (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক ধারা তথা কুবরাউইপ্স (Kubrawiyya) সূফী মতবাদের সাথে যুক্ত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
সাফল্যের চূড়ায় থেকেও একপর্যায়ে জাগতিক ধন-সম্পদের প্রতি তাঁর তীব্র বৈরাগ্য তৈরি হয়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, পার্থিব সম্পদ নশ্বর, আর আল্লাহর প্রেমই শাশ্বত। ফলশ্রুতিতে, তিনি তাঁর সমস্ত ব্যবসা, ধন-সম্পদ ও জাগতিক মোহ ত্যাগ করে মক্কা শরিফের উদ্দেশ্যে হজের সফরে বের হন এবং পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর ধ্যানে নিজেকে সমর্পণ করেন।
২. জীবনের মোড় ঘোরানো অলৌকিক ঘটনা (The Miracle of Oil)
হাজী আলী (রহ.)-এর জীবনে ভারতবর্ষ অভিমুখী হওয়ার পেছনে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অলৌকিক ঘটনা বা 'কারামত' জড়িয়ে রয়েছে।
একদা তিনি বোখারার এক নির্জন স্থানে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। এমন সময় এক ক্রন্দনরতা নারী তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হাজী আলী (রহ.) তাঁর কান্নার কারণ জানতে চাইলে মহিলাটি শূন্য পাত্র দেখিয়ে বলেন, অসাবধানতাবশত তাঁর পাত্র থেকে সবটুকু তেল মাটিতে পড়ে গেছে। তাঁর নিষ্ঠুর স্বামী জানতে পারলে তাঁকে তীব্র নির্যাতন করবেন।
মহিলার এই অসহায়ত্বে সূফী সাধকের হৃদয় আর্দ্র হয়ে ওঠে।তিনি মহিলাকে শান্ত হতে বলেন এবং যেখানে তেল পড়েছিল সেখানে যান। এরপর তিনি নিজের আঙুল বা বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটির বুকে মৃদু চাপ দেন। সাথে সাথে এক অলৌকিক ঝরনার মতো মাটি থেকে বিশুদ্ধ তেল নির্গত হতে শুরু করে এবং মহিলার পাত্রটি পুনরায় পূর্ণ হয়ে যায়। মহিলাটি অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে বাড়ি ফিরে যান।
৩. আধ্যাত্মিক অনুশোচনা ও ভারতবর্ষে হিজরত
মহিলাকে সাহায্য করলেও, এই অলৌকিক ঘটনার পর হযরত হাজী আলী (রহ.) এক গভীর আত্মিক সংকটে পড়েন। তাঁর মনে হতে থাকে, তেল বের করার জন্য মাটির বুকে আঘাত করে তিনি হয়তো 'জমিন বা আল্লাহর সৃষ্টিকে আহত' করেছেন। এই গভীর অনুশোচনা ও অনুতাপের কারণে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং স্বপ্নে বারবার সেই দৃশ্য দেখতে থাকেন।
can না পেয়ে আত্মার প্রশান্তি এবং ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর মায়ের অনুমতি নিয়ে ভাইসহ ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাত্রাপথে তাঁরা মুম্বাইয়ের ওরলি উপকূলের (Worli Seaface) কাছে এসে পৌঁছান। এখানকার শান্ত পরিবেশ ও সমুদ্রের হাওয়া তাঁর শরীর ও মনকে শান্ত করে তোলে। তিনি স্থায়ীভাবে এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ভাইকে চিঠি দিয়ে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে দেশে ফেরত পাঠান। তৎকালীন দিল্লী বা গুজরাট সালতানাতের আমলে তিনি এই অঞ্চলে অবস্থান করে মানুষের মাঝে সূফীবাদের প্রেম, সাম্য, মানবতা এবং ইসলামের সুমহান বাণী ছড়িয়ে দিতে থাকেন।
৪. ওফাত ও কাফনের অলৌকিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
হযরত হাজী আলী শাহ বুখারী (রহ.) তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওরলির উপকূলে সাধারণ মানুষকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দান করেছেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর অনুসারীদের এক অদ্ভুত ও রহস্যময় অসিয়ত করে যান। তিনি নির্দেশ দেন: "আমার মৃত্যুর পর আমাকে যেন কোনো সাধারণ গোরস্থানে দাফন না করা হয়। আমার পবিত্র কাফন পরিহিত দেহ (বা কফিন) যেন আরব সাগরের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সমুদ্রের ঢেউ যেখানে নিয়ে তাকে স্থির করবে, সেখানেই যেন আমার সমাধি তৈরি হয়।"
পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (১৪㠱 খ্রিষ্টাব্দের কিছু আগে) যখন তিনি ওফাত লাভ করেন, তখন অনুসারীরা তাঁর অসিয়ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। সাগরে ভাসিয়ে দেওয়ার পর অলৌকিকভাবে তাঁর পবিত্র দেহটি স্রোতের বিপরীতে ভেসে গিয়ে ওরলি উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে সমুদ্রের মাঝখানে একটি ছোট পাথুরে ঢিবির ওপর এসে আটকে যায়।
৫. হাজী আলী দরগাহ: সমুদ্রের বুকে মানবতার বাতিঘর
যে পাথুরে স্থানে তাঁর দেহটি আটকে গিয়েছিল, ১৪৩১ সালে ভক্তদের সহায়তায় ঠিক সেই স্থানেই তাঁর পবিত্র মাজার শরীফ ও মসজিদটি নির্মাণ করা হয়।
শত শত বছর ধরে জোয়ার-ভাটার তীব্র স্রোত এবং ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড় আছড়ে পড়লেও, অলৌকিকভাবে এই দরগাহের মূল কাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি। বর্তমানে এটি ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের এক অপরূপ নিদর্শন। প্রতি বছর হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৬ রবিউস সানি তাঁর পবিত্র উরস মোবারক উদযাপিত হয়, যেখানে লাখো ভক্তের সমাগম ঘটে।
সূফী বার্তা
হাজী আলী শাহ বুখারী (রহ.)-এর জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে জাগতিক প্রাচুর্যকে তুচ্ছ করে আল্লাহর প্রেমে বিলীন হওয়া যায়। সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা এবং প্রকৃতির প্রতি সম্মান প্রদানের যে অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি তাঁর অনুশোচনার মাধ্যমে রেখে গেছেন, তা সূফী দর্শনের এক চরম পরাকাষ্ঠা।