মাইজভান্ডারী তরীকা এবং উছুলে ছাবয়া-র মূল আধ্যাত্মিক দর্শন
বাংলার বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (ক.) প্রবর্তিত আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো 'উছুলে ছাবয়া' বা সপ্ত-পদ্ধতি। নফস দমন, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এই ৭টি অনন্য স্তর বা আধ্যাত্মিক নিয়মাবলির বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
হৃদয়ে চট্টগ্রাম

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (১৫ জানুয়ারি ১৮২৬ – ২৩ জানুয়ারি ১৯০৬) হলেন ভারতীয় উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং এ অঞ্চলে সৃষ্ট একমাত্র সুফি ধারা 'মাইজভান্ডারী তরীকা'-এর প্রতিষ্ঠাতা। তাঁকে তাঁর অনুসারীরা পরম শ্রদ্ধায় 'গাউছুল আজম হযরত কেবলা' নামে ডাকেন।

নিচে তাঁর বংশ পরিচয়, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং তাঁর আধ্যাত্মিক দর্শনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:

১. বংশ পরিচয় ও জন্ম ইতিহাস

সৈয়দ আহমদ উল্লাহর পূর্বপুরুষগণ আদি সুফি সাধকদের ধারা অনুসরণ করে মদিনা থেকে বাগদাদ ও দিল্লি হয়ে বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ে আসেন। পরবর্তীতে তাঁদের এক শাখা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির প্রত্যন্ত মাইজভান্ডার গ্রামে বসতি স্থাপন করে।

তিনি ১৮২৬ সালের ১৪ বা ১৫ জানুয়ারি (১লা মাঘ, ১২৩৩ বঙ্গাব্দ) এই মাইজভান্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মতিউল্লাহ মাইজভান্ডারী এবং মাতা সৈয়দা খায়রুন্নেছা উভয়েই ধার্মিক ও সমভ্রান্ত বংশের মানুষ ছিলেন।

২. শিক্ষাজীবন ও পাণ্ডিত্য

শৈশব থেকেই তিনি অনন্য মেধার পরিচয় দেন।

• প্রাথমিক শিক্ষা: মাত্র ৪ বছর বয়সে গ্রামের মক্তবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। এরপর তিনি চট্টগ্রামের আজিমনগরস্থ একটি মাদ্রাসায় মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করেন।

• উচ্চশিক্ষা (কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা): ১২৬০ হিজরি (১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দ) নাগাদ তিনি তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘ ৮ বছর ইসলামী আইনশাস্ত্র (ফিকহ), হাদিস, তাফসির, দর্শন এবং আরবি সাহিত্য অধ্যায়ন করে ১৮৫১ সালে (১২৬৮ হিজরি) বিশেষ কৃতিত্বের সাথে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনে তাঁর মেধার জন্য তিনি মাসিক ৫০ টাকা পর্যন্ত শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেছিলেন।

৩. কর্মজীবন ও বিচারকের দায়িত্ব

শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি সরকারি ও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন:

• সরকারি কাজী (বিচারক): ১৮৫২ • সালে তিনি ব্রিটিশ রাজের অধীনে যশোর জেলার বিচার বিভাগীয় 'কাজী' (বিচারক) হিসেবে নিযুক্ত হন।

• প্রধান শিক্ষক (মোদাররেস): যশোরে এক বছর অত্যন্ত সততার সাথে দায়িত্ব পালনের পর তিনি পদত্যাগ করেন এবং কলকাতায় ফিরে আসেন। সেখানে বিখ্যাত মুন্সি বু-আলী মাদ্রাসার প্রধান মোদাররেস (প্রধান শিক্ষক) হিসেবে যোগ দেন।

৪. আধ্যাত্মিক রূপান্তর ও পীরের সান্নিধ্য

কলকাতায় অবস্থানকালেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিনি তৎকালীন কাদেরিয়া তরীকার মহান সুফি সাধক সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ সালেহ কাদেরী লাহোরী-এর সান্নিধ্যে আসেন এবং আধ্যাত্মিক দীক্ষা (বায়াত) গ্রহণ করেন। তাঁর পীরের অধীনে দীর্ঘ কঠোর রিয়াজত, জিকির ও সাধনার মাধ্যমে তিনি বেলায়েতের (আল্লাহর নৈকট্য) উচ্চ সোপানে আরোহণ করেন।

৫. মাইজভান্ডারে প্রত্যাবর্তন ও তরীকা প্রতিষ্ঠা

পীরের নির্দেশে ১৮৫৭ সালে তিনি চিরতরে কলকাতা ও চাকরিজীবন ত্যাগ করে নিজ গ্রাম মাইজভান্ডারে ফিরে আসেন। নিজ বাড়িতে তিনি এক আধ্যাত্মিক সাধনার ধারা শুরু করেন, যা পরবর্তীকালে মাইজভান্ডার দরবার শরীফ নামে পরিচিতি পায়।

তিনি সম্পূর্ণ নতুন এবং যুগোপযোগী একটি সুফি মতবাদ প্রবর্তন করেন, যা 'মাইজভান্ডারী তরীকা' বা 'ত্বরিকা-ই-মাইজভান্ডারিয়া' নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়। প্রচলিত কঠিন রীতিনীতির বাইরে গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত সহজ উপায়ে স্রষ্টার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির পথ প্রদর্শন করেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি অনুসারী রয়েছে।

৬. মাইজভান্ডারী দর্শনের মূল ভিত্তি: উছুলে ছাবয়া (সপ্ত-পদ্ধতি)

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারীর আধ্যাত্মিক দর্শন ৭টি প্রধান স্তরে বিভক্ত, যা মানবাত্মার অহংকার ও লোভ দূর করতে সাহায্য করে:

1. ফানা আনিল খাল্ক: মানুষের কাছ থেকে কোনো উপকারের আশা ত্যাগ করা।

2. ফানা আনিল হাওয়া: অনর্থক বা ক্ষতিকর পার্থিব কাজ বর্জন করা।

3. ফানা আনিল এরাদা: নিজের সব ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার উপর সমর্পণ করা।

4. মউতে আবয়্যাজ (সাদা মৃত্যু): ক্ষুধা বা উপবাসের মাধ্যমে আত্মসংযম।

5. মউতে আছওয়াদ (কালো মৃত্যু): অন্যের সমালোচনা বা গালি ধৈর্য সহকারে গ্রহণ করা।

6. মউতে আহমর (লাল মৃত্যু): রিপু বা মনের লোভ-লালসা থেকে মুক্তি লাভ।

7. মউতে আখজার (সবুজ মৃত্যু): অতি বিলাসী জীবন বর্জন করে সরল জীবনযাপন।

এই তরিকার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো 'তওহীদে আদিয়ান' বা সর্বধর্মের প্রতি পরমতসহিষ্ণুতা ও মানবপ্রেম। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে তিনি আপন করে নিতেন, যার ফলে এটি একটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্মিক রূপ লাভ করে।

৭. সাংস্কৃতিক অবদান (মাইজভান্ডারী গান)

এই তরীকার ভাবধারাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে জন্ম নেয় আধ্যাত্মিক সংগীতের এক নতুন ধারা, যা 'মাইজভান্ডারী গান' নামে পরিচিত। মহাকবি রমেশ শীল এবং লোকসাধক আবদুল গফুর হালীসহ বহু গীতিকার এই ধারায় ১০ হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন। এই গানগুলো বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।

৮. ওফাত বা তিরোধান

১৯০৬ সালের ২৩ জানুয়ারি (১০ মাঘ, ১৩১৩ বঙ্গাব্দ) সোমবার দিবাগত রাতে ৮০ বছর বয়সে এই মহান সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন। প্রতি বছর ১০ই মাঘ তাঁর ওফাত দিবস উপলক্ষে মাইজভান্ডার দরবার শরীফে প্রধান উরস শরিফ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও আশেকান সমবেত হন।

 

 

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী প্রবর্তিত আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল ভিত্তি হলো 'উছুলে ছাবয়া' বা সপ্ত-পদ্ধতি। সুফি পরিভাষায় 'উছুল' শব্দের অর্থ মূলনীতি এবং 'ছাবয়া' মানে সাত। অর্থাৎ, মানবাত্মার অহংকার ও লোভ দূর করে আল্লাহর নৈকট্য বা 'বেলায়েত' অর্জনের জন্য তিনি সাতটি আধ্যাত্মিক স্তর বা রিয়াজতের নিয়ম নির্ধারণ করেছেন।

এই সাতটি পদ্ধতিকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: প্রথম তিনটি স্তরকে বলা হয় 'ফানা' (আত্মবিলোপ) এবং পরের চারটি স্তরকে বলা হয় 'মউত' (আধ্যাত্মিক মৃত্যু বা আত্মসংযম)।

sufi.news একটি ব্যতিক্রমী অনলাইন নিউজ পোর্টাল, যা বিশ্বজুড়ে সুফি দর্শন, আধ্যাত্মিক চেতনা ও শাশ্বত শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে। আজকের কোলাহলপূর্ণ বিশ্বে মানুষের মনের শান্তি ও আত্মার খোরাক জোগাতে এটি একটি আধ্যাত্মিক সেতু। আমরা ইতিহাসের মহান সুফি সাধকদের জীবনী, মরমী সাহিত্য, কাওয়ালি-মাইজভান্ডারী সংগীত এবং আত্মশুদ্ধির প্রামাণ্য গাইডলাইন প্রকাশ করি। কোনো চটকদার খবর নয়; বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার সাথে আধ্যাত্মিক চেতনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি শান্তিময় ও মানবিক সমাজ গঠনে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Comments

https://sufi.news/assets/images/user-avatar-s.jpg

0 comment

Write the first comment for this!