নক্বশেবন্দী তরিকার এগারোটি মূলনীতি (الأصول الأحد عشر للطريقة النقشبندية)
নক্বশেবন্দী তরিকার আধ্যাত্মিক সাধনা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণে অবিচল থাকার জন্য এগারোটি বিশেষ মূলনীতি রয়েছে। এগুলো ফারসি পরিভাষায় উসুলে ইয়াদ্দাহগানা (اصول یازدہ گانہ) নামে পরিচিত।
প্রতিটি মূলনীতি একজন সালিকের (আধ্যাত্মিক পথের অনুসারী) বাহ্যিক জীবন, অন্তর্জগৎ, চিন্তা, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে সুশৃঙ্খল করার শিক্ষা দেয়।
নিচে এগারোটি মূলনীতির বাংলা নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো।
এগারোটি মূলনীতি ও তাদের ব্যাখ্যা
১. হুশ দার দাম (هوش در دم)
শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি সচেতনতা (Awareness in the Breath)
প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে আল্লাহ তাআলার স্মরণের ব্যাপারে সচেতন থাকা। একজন সালিক যেন কোনো শ্বাসই গাফলতি বা আল্লাহর স্মরণবিমুখতায় অতিবাহিত না করেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর প্রতি অন্তরের সচেতনতা বজায় রাখাই এ মূলনীতির শিক্ষা।
২. নযর বার কদম (نظر بر قدم)
পদক্ষেপের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি (Watchfulness over Every Step)
নিজের প্রতিটি পদক্ষেপ, কাজ ও চলার পথ সম্পর্কে সচেতন থাকা। একজন সালিক যেন নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হন এবং দৃষ্টি ও মনকে অনর্থক বিষয় থেকে সংযত রাখেন। এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো আত্মসংযম, সতর্কতা ও লক্ষ্যনিষ্ঠা।
৩. সফর দার ওয়াতান (سفر در وطن)
নিজের অন্তর্জগতে আধ্যাত্মিক সফর (The Journey Within)
এটি বাহ্যিক ভ্রমণ নয়; বরং নিজের নফস ও অন্তর্জগতে আত্মশুদ্ধির যাত্রা। নিন্দনীয় চরিত্র ও প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে প্রশংসনীয় গুণাবলি অর্জনের প্রচেষ্টাই হলো এই সফর। অর্থাৎ নিজের ভেতরের পরিবর্তনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা।
৪. খালওয়াত দার আনজুমান (خلوت در انجمن)
জনসমাগমের মধ্যেও অন্তরের নির্জনতা (Solitude in the Crowd)
মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপন করেও অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট রাখা। বাহ্যিকভাবে মানুষের সঙ্গে থাকা, কিন্তু অন্তরের গভীরে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ও স্মরণ অটুট রাখা। সংসার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেও আল্লাহর স্মরণে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয় এই মূলনীতি।
৫. ইয়াদ কার্দ (یاد کرد)
আল্লাহর স্মরণ (Remembrance)
জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা। নক্বশেবন্দী তরিকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো জিকিরে খাফি বা নীরব জিকির। অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত করা এবং জিকিরের মাধ্যমে গাফলতি দূর করাই এই মূলনীতির উদ্দেশ্য।
৬. বাজ গাশত (باز گشت)
আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন (Returning to Allah)
জিকিরের সময় অন্তরকে বারবার আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরিয়ে নেওয়া। চিন্তা ও কল্পনা যখন অন্যদিকে চলে যায়, তখন তা থেকে মনোযোগ ফিরিয়ে আল্লাহর স্মরণে স্থির হওয়া। নিজের ইবাদত ও জিকিরকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত রাখার শিক্ষাও এর অন্তর্ভুক্ত।
৭. নিগাহ দাশত (نگاه داشت)
অন্তরের মনোযোগ সংরক্ষণ (Guarding the Attention)
অন্তরে উদ্ভূত অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা, কল্পনা ও অমনোযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করা। বিশেষ করে জিকিরের সময় মনোযোগকে অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়তে না দেওয়া এবং অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে স্থির রাখার প্রচেষ্টা করা।
৮. ইয়াদ দাশত (یاد داشت)
সর্বক্ষণ আল্লাহর স্মরণের উপস্থিতি (Continued Remembrance)
আল্লাহ তাআলার স্মরণ ও তাঁর প্রতি অন্তরের সচেতনতা অব্যাহত রাখা। জিকিরের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরেও অন্তরে আল্লাহর স্মরণের অনুভূতি বজায় রাখার সাধনা। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক মনোযোগ, যেখানে সালিকের অন্তর সর্বদা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তিত থাকে।
৯. উকূফে যামানি (وقوف زمانی)
সময় ও নিজের অবস্থার প্রতি সচেতনতা (Awareness of Time)
নিজের সময় কীভাবে অতিবাহিত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা। নিজের আমল ও আধ্যাত্মিক অবস্থার হিসাব নেওয়া। ভালো কাজ সম্পন্ন হলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং ভুল বা গুনাহ হয়ে গেলে তাওবা ও ইস্তিগফার করা। সময়ের যথাযথ ব্যবহার এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করাই এর শিক্ষা।
১০. উকূফে আদাদি (وقوف عددی)
সংখ্যার প্রতি সচেতনতা (Awareness of Number)
জিকিরের নির্ধারিত সংখ্যা ও গণনার প্রতি সচেতন থাকা। জিকিরের সংখ্যা যথাযথভাবে পূর্ণ হচ্ছে কি না এবং মনোযোগের সঙ্গে তা সম্পন্ন হচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা। এর মাধ্যমে জিকিরের শৃঙ্খলা ও নিয়মিততা বজায় রাখা হয়।
১১. উকূফে কলবি (وقوف قلبی)
অন্তরের প্রতি সচেতনতা (Awareness of the Heart)
নিজের অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকা এবং অন্তরকে আল্লাহ তাআলার স্মরণে নিবিষ্ট রাখার সাধনা করা। জিকিরের সময় অন্তরের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং হৃদয়কে গাফলতি, অহংকার, হিংসা ও অন্যান্য আত্মিক ব্যাধি থেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করাই এই মূলনীতির উদ্দেশ্য।